জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

ঢাকায় আরও ৫০ মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত

রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে ঢাকার আরও ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ সংকেত ব্যবস্থা স্থাপনে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ হবে।

তবে এই অর্থ কেবল সংকেতবাতি কেনা বা বসানোর জন্য নয়। প্রকল্পের আওতায় থাকবে সংকেতবাতির খুঁটি ও ভিত্তি নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্টিলের নিরাপত্তাবেষ্টনী, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সড়ক খনন, ক্যামেরা, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাবসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সরঞ্জাম। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অবশ্য এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮টি স্থানে সংকেতবাতি স্থাপনে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি স্থানে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। দুই সিটি মিলিয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা।

প্রকল্পের অর্থায়নে দুই সিটি করপোরেশনকে সমানভাবে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় দরপত্র ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময় নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

নির্মাণ ও প্রযুক্তির কাজ ভাগ করে দেওয়া হবে

নতুন সংকেতব্যবস্থার কাজ মূলত দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নিয়োগ করা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোগত বা পূর্তকাজ করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সংকেতব্যবস্থার নকশা, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কাজের দায়িত্ব পালন করবে।

ঠিকাদারের কাজের মধ্যে থাকবে সংকেতের উভয় পাশে ৫০ মিটার করে স্টিলের বেড়া নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি, সংকেতবাতির খুঁটি ও ভিত্তি নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক খনন বা কাটার কাজ।

প্রযুক্তিগত অংশে সংকেতবাতি, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাব ও ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি যানবাহনের চলাচল ও সংশ্লিষ্ট সড়কের ট্রাফিক পরিস্থিতি নিয়ে জরিপও করা হবে। ফলে প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু নতুন বাতি বসানো নয়; বরং একটি সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা।

উত্তরের ২৮ স্থানে ব্যয় ৫৫ কোটি

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হিসাবে, ২৮টি স্থানে সংকেতব্যবস্থা স্থাপনের পূর্তকাজে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে স্টিলের বেড়া নির্মাণে। এ খাতে প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

সংকেতবাতির খুঁটি নির্মাণে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং খুঁটির ভিত্তি তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। বিদ্যুতায়নের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। নিয়ন্ত্রণ বক্স, সড়ক খনন, ট্রাফিক সাইনসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা।

এর বাইরে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, সংকেতবাতি এবং কারিগরি পরামর্শের জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে উত্তর সিটির ২৮টি স্থানে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি স্থানে পূর্তকাজে ব্যয় হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও কারিগরি কাজের জন্য প্রায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ সিটির অংশে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা।

আগের পরীক্ষামূলক সংকেতব্যবস্থার পর নতুন উদ্যোগ

রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেতব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন সংকেতবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব সংকেতব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

প্রথম পর্যায়ে দক্ষিণ সিটির ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ও বাংলামোটর এবং উত্তর সিটির সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় সংকেতব্যবস্থা চালু করা হয়। পরে কয়েকটি সংকেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা যুক্ত করা হয়।

এই প্রযুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত করা এবং সংকেত অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্বয়ংক্রিয় সংকেত চালুর ফলে অনেক ক্ষেত্রে চালকদের সংকেত মেনে চলার প্রবণতা বেড়েছে। এতে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ওপরও চাপ কমতে পারে।

তবে নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই রাজধানীর যানজট পুরোপুরি দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ঢাকার যানজটের পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত পার্কিং, সড়কে অবৈধ দখল, পথচারী চলাচলের সমস্যা, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা, ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানবাহনের একই পথে চলাচলসহ নানা কারণ। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যান অনেক এলাকায় সংকেত ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

ফলে নতুন ৫০টি সংকেত কার্যকর করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পুরোনো ও নতুন সংকেতগুলোর মধ্যে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রাজধানীর ব্যস্ত মোড়গুলোতে যান চলাচল আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও সুশৃঙ্খল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পিতভাবে কাজ শেষ করা গেলে নতুন ৫০টি স্বয়ংক্রিয় সংকেত রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে। তবে সেই পরিবর্তনের স্থায়ী সুফল নির্ভর করবে সংকেতগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সড়ক ব্যবহারকারীদের আইন মেনে চলার ওপর।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর