জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

গোলাম সারওয়ার: সাংবাদিকতার আকাশে এক দীপ্তিমান নক্ষত্র

“সত্যের পক্ষে কলম ধরা শুধু পেশা নয়—এ এক ধরনের দায়বদ্ধতা।”

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে গোলাম সারওয়ার ছিলেন এক উজ্জ্বল, প্রজ্ঞাবান ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; দক্ষ সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক এবং সংবাদমাধ্যমের অভিভাবক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর লেখায় সময়ের সত্য উঠে এসেছে নির্মোহভাবে, আর তাঁর সম্পাদনায় সংবাদপত্র পেয়েছে ভাষা, উপস্থাপন ও চিন্তার নতুন মাত্রা।

১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন গোলাম সারওয়ার। শৈশব থেকেই লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন—যে সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৬৩ সালে দৈনিক পয়গমে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। এরপর তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে কাজ করেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকাল—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তাঁর কর্মদক্ষতা, সম্পাদনাগত বিচক্ষণতা এবং সংবাদবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে সম্পাদক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব সংবাদপত্রকে শুধু খবর প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত তৈরির একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর কিছু সময় বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর পেশাগত ও সৃজনশীল আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত তাঁকে আবার সাংবাদিকতার জগতে ফিরিয়ে আনে।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও মননশীল লেখালেখিতেও গোলাম সারওয়ার রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রঙিন বেলুন’, ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’ এবং ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’। এসব লেখায় সমাজ, রাজনীতি, মানুষ ও সময়কে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। তাঁর ভাষা ছিল সহজ অথচ শক্তিশালী; বিশ্লেষণে ছিল যুক্তি, পর্যবেক্ষণে ছিল সূক্ষ্মতা এবং লেখায় ছিল রসবোধ।

দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এর বাইরে ২০১৬ সালে কালচারাল জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ-এর আজীবন সম্মাননা এবং ২০১৭ সালে আতাউস সামাদ স্মারক ট্রাস্টের আজীবন সম্মাননাও অর্জন করেন।

সাংবাদিকতার পেশাগত পরিসরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতিসহ বিভিন্ন দায়িত্বে তিনি ছিলেন সক্রিয়। সেন্সর বোর্ডের আপিল বিভাগের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।

গোলাম সারওয়ারের সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সত্য ও দায়িত্বের প্রতি দৃঢ় অবস্থান। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্যের গুরুত্ব, সম্পাদনার ক্ষেত্রে ভাষার সৌন্দর্য এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নৈতিক দায়বদ্ধতাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর কাছে সংবাদপত্র ছিল কেবল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; মানুষের কথা বলার, অন্যায় প্রশ্ন করার এবং সমাজের সামনে সত্য তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন গোলাম সারওয়ার। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি যে পেশাগত মানদণ্ড, সম্পাদনাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখার ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন বরেণ্য সাংবাদিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল্যবোধ, দায়িত্বশীল সম্পাদনা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যকে স্মরণ করা।

মানুষের জীবন একসময় থেমে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম এবং চিন্তার প্রভাব থেকে যেতে পারে বহুদিন। গোলাম সারওয়ারও সেই অর্থে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি স্থায়ী অধ্যায়। তাঁর কলম থেমে গেছে, কিন্তু সত্য ও দায়িত্বের পক্ষে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এখনো নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

বরেণ্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখক গোলাম সারওয়ারের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

তাঁর কলমের আলো, সাংবাদিকতার আদর্শ ও কর্মের দীপ্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকুক।

Tags :

Shourav Gurukul

Recent News