জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১০:১ এএম

সংঘাত ও সামরিক অবরোধের জোড়া আঘাতে থমকে গেছে গাজা উপত্যকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। চরম পানীয় জলের সংকট, ভেঙে পড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং চারপাশের বর্জ্যের স্তূপে সেখানকার ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকা এখন এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্বজুড়ে এই মানবিক বিপর্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ওসিএইচএ-এর সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, গাজার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ১৩ লাখের বেশি বাসিন্দা প্রতিদিন মাথাপিছু ৬ লিটারেরও কম পানি পাচ্ছেন, যা তারা পান করা এবং রান্নার কাজে ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। মানবীয় জরুরি অবস্থায় একজন ব্যক্তির সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, গোসল, রান্না ও পানের জন্য যেখানে দৈনিক সর্বনিম্ন ১৫ লিটার পানির প্রয়োজন, সেখানে গাজাবাসীর প্রাপ্তি অর্ধেকেরও কম।
এছাড়া, উপত্যকাটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি বা প্রায় ৭ লাখ মানুষ দৈনিক মাথাপিছু ৯ লিটারের কম পানি পাচ্ছে। এই অপ্রতুল পানি নিয়ে পরিবারগুলোর পক্ষে নিত্যদিনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা এবং ছোট শিশুদের মৌলিক চাহিদা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
গাজার অধিকাংশ গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য প্রতিদিনের বিশুদ্ধ পানি জোগাড় করাই এখন প্রধান যুদ্ধ। স্থানীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘ কয়েকটি প্রধান দিক চিহ্নিত করেছে:
দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভিড়: সীমিত পানি বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে শুরু হয় শত শত মানুষের ভিড় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন।
আধার ও পাত্রের ঘাটতি: গাজার অধিকাংশ পরিবারের কাছে পানি পরিবহন ও সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত বালতি, কন্টেইনার বা পাত্র নেই।
পানির ভারে নুইয়ে পড়া শৈশব: প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি পরিবারের খুদে সদস্যদেরও দূর-দূরান্ত থেকে ভারি পাত্রে করে পানি বহনের কাজে নামতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
হাতে গোনা ত্রাণ ব্যবস্থা: গাজার ৭৫ শতাংশ বা প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন মানুষ এখন পুরোপুরি পানি সরবরাহকারী ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল।
গত মাসে বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো গাজাজুড়ে স্থাপিত ২,৫০০টির বেশি পানি বিতরণ পয়েন্টে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ১০০টিরও বেশি সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে জরুরি ভিত্তিতে পানি পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ও অবরোধের কারণে এই সহায়তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
পানির পাশাপাশি গাজার স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো পুরোপুরি ধসে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার মাত্র ৫০ শতাংশ পরিবার কোনোমতে মৌলিক স্যানিটেশন বা শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে।
নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবাসিক এলাকাগুলোর আনাচে-কানাচে জমে উঠেছে হাজার হাজার টন আবর্জনা। ফলে ৯ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি সরাসরি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এতে পানিবাহিত জটিল ব্যাধি, চর্মরোগ এবং ডায়রিয়াসহ নানা সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা একটি অনাগত মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে নির্দেশ করছে।
মন্তব্য