জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ, হাতছানি দিচ্ছে একাধিক রেকর্ড

দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আবারও টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের পর দেশটিতে আর কোনো টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি টাইগারদের। সেই দীর্ঘ বিরতির পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথম টেস্টে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া।

বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে ৬টায় শুরু হবে ম্যাচটি। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে ২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি দুই দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের সামনে ব্যক্তিগত মাইলফলক ছোঁয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

৭ হাজার রানের সামনে মুশফিক

বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিমের সামনে অপেক্ষা করছে দেশের ক্রিকেটে অনন্য এক অর্জন। প্রায় ২১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১০৩ ম্যাচের ১৯০ ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ৬ হাজার ৮০৬ রান। তাঁর নামের পাশে রয়েছে ১৪টি সেঞ্চুরি ও ২৯টি হাফসেঞ্চুরি।

আর ১৯৪ রান করতে পারলেই বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ৭ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করবেন মুশফিক। অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশনে সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তবে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

মুশফিক ৭ হাজার রান পূর্ণ করতে পারলে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন হবে না; বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হবে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরির অপেক্ষায় স্মিথ

অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটার স্টিভেন স্মিথের সামনে রয়েছে ভিন্ন ধরনের একটি মাইলফলক। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষেই এখনো টেস্ট সেঞ্চুরি করতে পারেননি তিনি।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ সফরে দুই টেস্টে খেলেছিলেন স্মিথ। সেই সিরিজে ২৯.৭৫ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ছিল ১১৯ রান। নিজের মানদণ্ডে যা মোটেই সন্তোষজনক পারফরম্যান্স নয়।

এবার নিজের দেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই অপূর্ণতা দূর করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। ফলে বাংলাদেশের বোলারদের জন্য স্মিথকে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হবে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

৩০০ উইকেটের অপেক্ষায় হ্যাজেলউড

অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অস্ত্র জশ হ্যাজেলউডও দাঁড়িয়ে আছেন বড় এক মাইলফলকের সামনে। টেস্টে তাঁর উইকেটসংখ্যা এখন ২৯৫। দুই ম্যাচের সিরিজে আর পাঁচটি উইকেট পেলেই ৩০০ উইকেটের ক্লাবে প্রবেশ করবেন তিনি।

এই কীর্তি গড়তে পারলে টেস্ট ইতিহাসে ৩০০ উইকেট নেওয়া ৪২তম বোলার এবং অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হবেন হ্যাজেলউড। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নতুন বলে তাঁর নিখুঁত লাইন ও লেংথ বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

স্টার্কের সামনে কপিল ও স্টেইন

মিচেল স্টার্কও রেকর্ডের কাছাকাছি রয়েছেন। ১০৫ টেস্টে ২০২ ইনিংসে বোলিং করে বাঁহাতি এই পেসার নিয়েছেন ৪৩১ উইকেট।

ভারতের কিংবদন্তি কপিল দেবের ৪৩৪ উইকেট ছাড়িয়ে যেতে স্টার্কের প্রয়োজন আর পাঁচ উইকেট। আর ৯টি উইকেট নিতে পারলে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক পেসার ডেল স্টেইনের ৪৩৯ উইকেটও পেছনে ফেলবেন।

ফলে দুই টেস্টের এই সিরিজে স্টার্কের বোলিং পারফরম্যান্স শুধু অস্ট্রেলিয়ার ফলাফলের জন্য নয়, ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ওপেনিংয়ে হেডের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং

বাংলাদেশের বোলারদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে বড় হুমকি হতে পারেন ট্রাভিস হেড। ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করার পর তাঁর আগ্রাসী ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শুরুতেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করার অন্যতম কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সাল থেকে ওপেনার হিসেবে ব্যাটিং করা হেডের স্ট্রাইক রেট ৯১.৭। একাধিক ইনিংসে ওপেন করা ব্যাটারদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। বাউন্ডারি মারার ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রাসন স্পষ্ট—ওপেনার হিসেবে প্রতি ১০০ বলে গড়ে ১২.৭টি বাউন্ডারি মেরেছেন তিনি।

তাই নতুন বলে বাংলাদেশের বোলারদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে শুরুতেই হেডকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাঁকে দ্রুত ফেরানো না গেলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম সেশনেই বড় রান তোলার ভিত্তি তৈরি করে ফেলতে পারে।

পেস আক্রমণই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের শক্তি নিয়ে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত দুই বছরে টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা প্রতি উইকেটে গড়ে মাত্র ২০.৭৫ রান দিয়েছেন। একই সময়ে তাদের চেয়ে কম বোলিং গড় রয়েছে কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার পেসারদের—২০.১৬।

ডানহাতি ব্যাটারদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের পরিসংখ্যান আরও কার্যকর। এই ধরনের ব্যাটারদের বিপক্ষে তাঁদের বোলিং গড় ১৯.৫৫। বাঁহাতিদের বিপক্ষে সেটি ২৪.০৮।

বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে ডানহাতি ব্যাটারের সংখ্যাই বেশি। ফলে সিরিজের আগে এই পরিসংখ্যান টাইগারদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। নতুন বল সামলানো, অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকা বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

রেকর্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের বড় পরীক্ষা

মুশফিকের ৭ হাজার রান, স্মিথের বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, হ্যাজেলউডের ৩০০ উইকেট এবং স্টার্কের কপিল দেব ও ডেল স্টেইনের রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে সিরিজটিতে ব্যক্তিগত মাইলফলকের কমতি নেই।

তবে বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে ফেরাটাই তাদের জন্য বড় পরীক্ষা।

ডারউইনের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামলাতে হবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পেস আক্রমণ। অন্যদিকে বোলারদের সামনে থাকবে স্মিথ ও হেডের মতো অভিজ্ঞ ও আগ্রাসী ব্যাটারদের থামানোর কঠিন দায়িত্ব।

দীর্ঘ বিরতির পর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল দুই ম্যাচের একটি সিরিজ নয়। এটি পুরোনো প্রতিপক্ষের মাটিতে নিজেদের টেস্ট সামর্থ্য যাচাইয়ের বড় সুযোগ। একই সঙ্গে দুই দলের একাধিক তারকার জন্যও অপেক্ষা করছে স্মরণীয় কিছু ব্যক্তিগত অর্জনের সম্ভাবনা।

Tags :

Shourav Gurukul

Recent News