জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

তালেবানি শাসনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ: শিক্ষাবঞ্চিত ২৪ লাখ আফগান কিশোরী

আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা দখলের পর থেকে চরম অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে দেশটির সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে নারী সমাজের ওপর। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) সাম্প্রতিক এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবান সরকারের নানা ধরনের কড়াকড়ি এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। অথচ চলতি সপ্তাহে তালেবান সরকার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পাঁচ বছর পূর্তি উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও বেশ কিছু দেশ এই প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে শুরু করেছে।
ইউনেস্কো তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে বর্তমান বিশ্বে একমাত্র আফগানিস্তানেই রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী ও মেয়েদের মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এই কঠোর নীতি সমগ্র জাতিকে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনার আলো থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে দেশে চরম দারিদ্র্য আরও প্রকট আকার ধারণ করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে। গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি জানিয়েছে, শিক্ষা বন্ধ থাকার এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে আগামী ২০৬৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের কর্মক্ষেত্র থেকে প্রায় ছয় লাখ নারী কর্মজীবী ছিটকে পড়বেন। যার আর্থিক প্রভাব পড়বে সরাসরি অর্থনীতিতে, এবং এর কারণে প্রায় ৯৬০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সামগ্রিক আয়ের ক্ষতি হতে পারে। শিক্ষার সুযোগ বন্ধ থাকায় সমাজে বাল্যবিয়ে ও অকাল বিয়ের প্রবণতাও আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংকটের শুরুটা হয়েছিল ২০২১ সালে। ওই বছর বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করার পর তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কথা দিয়েছিল যে নারীদের শিক্ষার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। ২০২২ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ করেই মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ঠিক কয়েকমাসের মাথায় ডিসেম্বরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দরজাও নারীদের জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও তালেবান নেতৃত্ব বরাবরই দাবি করে আসছে যে এগুলো সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং তারা শরিয়া আইন ও নিজস্ব সংস্কৃতির আওতায় নারীদের অধিকার রক্ষা করছে, বাস্তবে নারীদের চাকরি, জনসমক্ষে যাতায়াত এবং স্বাভাবিক চলাচলের ওপর একের পর এক খড়্গ নেমে এসেছে।
উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি প্রাথমিক স্তরেও এক ভয়াবহ শিক্ষক সংকট তৈরি করেছে। দেশটিতে যোগ্য নারী শিক্ষকের অভাবে প্রাথমিক শিক্ষা খাত এখন ধসের মুখে। ইউনেস্কোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে দক্ষ ও যোগ্য নারী শিক্ষকের ঘাটতি ১১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। জরুরি শিক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়ক হুদা জাবরিয়ান গণমাধ্যমকে জানান, অনেক মেধাবী শিক্ষক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আর যারা এখনো দেশের ভেতরে রয়েছেন, তাদের শিক্ষকতা পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পুরুষ শিক্ষকদের দিয়ে ছেলেদের স্কুলগুলো পরিচালিত হলেও মেয়েদের স্কুলে নারী শিক্ষক নিষিদ্ধ থাকায় প্রাথমিক স্তরে চরম হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষকই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্রটি অত্যন্ত করুণ। বর্তমানে আফগানিস্তানের জাতীয় সাক্ষরতার হার নেমে এসেছে মাত্র ৩৭ শতাংশে। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে দেশের দশ বছর বয়সী শিশুদের ৯০ শতাংশের বেশি একটি সাধারণ বাক্যও পড়তে পারছে না। অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা অনুপস্থিত এবং তীব্র শীতে উষ্ণতা ধরে রাখার কোনো পরিকাঠামো নেই। এর ওপর যোগ হয়েছে নতুন সংকট। বিগত বছরগুলোতে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্প ও বিধ্বংসী বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশের অন্তত এক হাজার বিদ্যালয় স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে লাখ লাখ শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আজ চরম হুমকির মুখে।
Tags :

Shourav Gurukul

Recent News