গত মৌসুমে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে মাঠের বাইরের নানা বিতর্কেই বেশি আলোচনায় ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তার প্রভাব পড়েছিল দলের পারফরম্যান্সেও। শেষ পর্যন্ত কোনো বড় ট্রফি ছাড়াই মৌসুম শেষ করতে হয় স্প্যানিশ জায়ান্টদের। এরপর কোচের পদে পরিবর্তন আসে। নতুন দায়িত্ব নিয়ে জোসে মরিনিওর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—দলের ভেতরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ড্রেসিংরুমে ঐক্য তৈরি করা।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর আবার রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে ফিরেছেন পর্তুগিজ এই কোচ। ক্লাবটিতে তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১১-১২ মৌসুমে রেকর্ড পয়েন্ট সংগ্রহ করে লা লিগা জিতেছিল রিয়াল। তবে সেই সময়ের শেষদিকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিরোধ ও ড্রেসিংরুমের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তাঁর অধ্যায়কে বিতর্কিত করে তুলেছিল। এবারও দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলকে আরও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতির সময়ই ভালদেবেবাসের অনুশীলনকেন্দ্রে মরিনিও নিজের কাজের ধরন স্পষ্ট করে দিয়েছেন। স্পেনের ক্রীড়া দৈনিক এএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন রুটিনে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন তিনি। পুষ্টি, সময়ানুবর্তিতা, চোটের পুনর্বাসন এবং অনুশীলনের প্রস্তুতি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
খাবারের ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন নিয়ম। খেলোয়াড়েরা এখন নিজেদের ইচ্ছামতো সকালের নাশতা কিংবা বিকেলের খাবার বেছে নিতে পারবেন না। ক্লাবের পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের তালিকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অনুশীলনের চাপ সামলানোর উপযোগী খাদ্যাভ্যাস তৈরি করাই এর লক্ষ্য। আগে খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা থাকলেও নতুন ব্যবস্থাকে দল ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ানুবর্তিতার বিষয়েও মরিনিও কোনো ছাড় দিতে চাইছেন না। আগে নির্ধারিত সময়ে না এলে খেলোয়াড়দের জরিমানা করা হতো। এখন নিয়ম আরও কঠোর। কেউ দেরি করে এলে তাঁকে দলীয় অনুশীলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না; বরং আলাদাভাবে জিমে অনুশীলন করতে হবে। একই সঙ্গে অনুশীলন কিংবা দলীয় সভার নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে ভালদেবেবাসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চোট পাওয়া খেলোয়াড়দের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়েও নতুন নীতি নিয়েছেন মরিনিও। ক্লাবের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। খেলোয়াড়দের পুনর্বাসনের পুরো প্রক্রিয়া রিয়ালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট মেডিকেল দলের তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কোচিং ও মেডিকেল স্টাফের মধ্যে সমন্বয় আরও সরাসরি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মরিনিওর কড়া নিয়মে এখন পর্যন্ত দলের ভেতরে বড় কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বরং খেলোয়াড়েরা শৃঙ্খলাভিত্তিক এই পরিবেশকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন বলে এএস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দলের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, ক্লাবের বর্তমান পরিবেশ খুবই ভালো।
মরিনিওর প্রত্যাবর্তনের পেছনে রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের প্রত্যাশাও কম নয়। জাবি আলোনসোর সংক্ষিপ্ত অধ্যায় এবং এরপর অন্তর্বর্তীকালীন কোচ আলভারো আরবেলোয়ার বিদায়ের পর দলের দায়িত্ব আবার অভিজ্ঞ মরিনিওর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য শুধু মাঠের ফল নয়, তারকা-সমৃদ্ধ দলটির ভেতরে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করা।
তবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠে। রিয়ালের মতো ক্লাবে তারকা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, কোচের কঠোর শৃঙ্খলা এবং দলের সামগ্রিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ নয়। মরিনিওর নিয়মগুলো প্রাক্-মৌসুমে কতটা কার্যকর থাকে এবং তারকা ফুটবলাররা দীর্ঘ মেয়াদে এই ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু ড্রেসিংরুমের শৃঙ্খলায় নয়, মাঠে রিয়ালের ট্রফি জয়ের সক্ষমতাতেও।









