খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৫০ পিএম

দেশে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বিস্তৃত হলেও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমছে না। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এরপর জুনে তা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং জুলাইয়ে বেড়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, এই প্রবণতার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং কিছু ব্যাংকের তারল্যসংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নগদের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ গত এক দশকেরও বেশি সময়ে কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুনে তা বেড়ে ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পরের দুই বছরেও বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। ২০২২ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি এবং ২০২৩ সালের জুনে ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেলেও চলতি অর্থবছরে আবার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মে শেষে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এরপর মাত্র দুই মাসে আরও প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা যোগ হয়েছে।
Table of Contents
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও নগদ অর্থ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তার সময় কিছু আমানতকারী ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেন।
ওই সময়ে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত বেরিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে আতঙ্কে অর্থ তুলে নেওয়া কিছু গ্রাহক আবার আমানত ফিরিয়ে আনেন।
ইসলামী ব্যাংকে নিযুক্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন জানিয়েছেন, ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রম বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।
তবে নগদ অর্থ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধির চিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা।
মে শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের মোট আমানত দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এ সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, নগদ অর্থ বৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক রয়েছে। একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন আগের তুলনায় বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বাজারে অর্থের নামমাত্র প্রবাহও বাড়ছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিনের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে খুচরা বাজারে একই ধরনের কেনাকাটায় বেশি অর্থ হাতবদল হচ্ছে। সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নগদে লেনদেন হয়।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে এলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিউআর কোড, পস মেশিন, কার্ড এবং ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সুবিধা আরও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়েও প্রায় একই পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে। ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহারও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলা কিউআর, আরটিজিএস, এনপিএসবি এবং মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা সম্প্রসারণে কাজ করছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন এখন দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তারপরও নগদ অর্থের পরিমাণ কমছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, দেশের মার্চেন্টদের বাংলা কিউআরের আওতায় আনা হয়েছে এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম আগের তুলনায় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি নগদ অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগের। মানুষ ব্যাংক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর একটি অংশ আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন। ফলে নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার হলে সাধারণভাবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে একই সময়ে ব্যাংক আমানত এবং ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ—দুটিই বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিকে তিনি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন। অর্থনীতির একটি বড় অংশ যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে পরিচালিত হয়, তাহলে সেই অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং কর পরিশোধের বিষয়গুলোও সামনে আসে। ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা, ঘুষ-দুর্নীতি এবং অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার বাড়লে নগদ অর্থের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
বাস্তবে ক্ষুদ্র ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা বাজারের একটি বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর। অনেক ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ থাকলেও ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের অভ্যাসের কারণে নগদ লেনদেন চালু রয়েছে। প্রত্যন্ত ও আধা-শহুরে এলাকায় ব্যাংকিং সেবার সীমিত উপস্থিতিও এই প্রবণতাকে দীর্ঘায়িত করছে।
ব্যাংকের বাইরে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ থাকা শুধু নগদ ব্যবহারের জনপ্রিয়তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের প্রশ্ন জড়িত।
একদিকে ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থ নগদ অবস্থায় ব্যাংকের বাইরে থাকছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে একই সময়ে একাধিক সঞ্চয় ও লেনদেনের প্রবণতা কাজ করছে। ফলে শুধু ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা বাড়লেই নগদ অর্থের ব্যবহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
নগদনির্ভরতা কমাতে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা পুনর্গঠন, আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দেওয়া, প্রত্যন্ত এলাকায় নির্ভরযোগ্য আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যাংকের বাইরে থাকা বিপুল নগদ অর্থ কোন উৎস থেকে আসছে এবং কোন খাতে যাচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র তৈরি করা। কারণ এই অর্থের গতিপ্রকৃতি বোঝা গেলে দেশের ভোগব্যয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, করব্যবস্থা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থার বর্তমান অবস্থাও আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
মন্তব্য