জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৫৮ পিএম

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার আনিস আলমগীর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক বিবৃতির ভাষা ও উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো স্বাভাবিক এবং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক হতে পারে। তবে সেই আপত্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতি, রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের প্রচলিত মানদণ্ড এবং পেশাদার কূটনৈতিক চর্চার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই বিষয়টি নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আনিস আলমগীর বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল এবং সরকার সেটিই করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সাধারণত যে ধরনের সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরিমিত ভাষা প্রত্যাশিত, সংশ্লিষ্ট বিবৃতিতে সেই বৈশিষ্ট্যের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি দাবি করেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশিত ওই বিবৃতি প্রকাশের পর একাধিকবার সম্পাদনা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্টটি অন্তত আটবার সংশোধন করা হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিবৃতি প্রকাশের পর বারবার সম্পাদনার প্রয়োজনীয়তা সরকারি প্রস্তুতি, পর্যালোচনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন, পোস্টটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া জমা হয়েছে। তাঁর মতে, সংবেদনশীল ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি ঘোষণার প্রতি এমন প্রতিক্রিয়া ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়ে জনমনে বিদ্যমান সংশয়ের প্রতিফলন হতে পারে।
বিবৃতিতে ব্যবহৃত কয়েকটি ইংরেজি শব্দগুচ্ছ নিয়েও তিনি আপত্তি জানান। তাঁর মতে, “Mafia enterprise”, “Henchmen”, “Venomous vitriol” এবং “Criminal cohort”-এর মতো শব্দ সাধারণ কূটনৈতিক নথির চেয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা বা জনসভায় ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি রাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভাষা এমন হওয়া উচিত, যা আবেগনির্ভর না হয়ে আইনি ভিত্তি, তথ্যনির্ভর যুক্তি এবং কূটনৈতিক সংযমকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ রাষ্ট্রীয় বিবৃতি অনেক সময় ভবিষ্যতের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন আনিস আলমগীর। তাঁর মতে, একটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের স্বার্থকে কার্যকর, শান্ত এবং পেশাদার উপায়ে তুলে ধরা। তিনি মনে করেন, কূটনৈতিক যোগাযোগের শক্তি উচ্চকণ্ঠ বা আক্রমণাত্মক ভাষায় নয়, বরং সুসংহত যুক্তি, প্রমাণভিত্তিক অবস্থান এবং পরিমিত শব্দচয়নে নিহিত থাকে।
বিশেষভাবে তিনি সেই অংশটির সমালোচনা করেন, যেখানে ভারতের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে বিষয়টিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী সাধারণত আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেল, বিশেষ করে ‘নোট ভার্বাল’ বা সমপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবহৃত হয়। প্রকাশ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন ভাষা ব্যবহৃত হলে তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সংলাপ ও আলোচনার ক্ষেত্রকে জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া “Dark days of fascism” কিংবা “Client State”-এর মতো রাজনৈতিক অভিধা ব্যবহারের বিষয়েও তিনি আপত্তি জানান। তাঁর মতে, এ ধরনের শব্দ রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির আনুষ্ঠানিক ভাষাকে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভাষা এক নয়; তাই দুটি ক্ষেত্রেই শব্দচয়ন ও উপস্থাপনার ধরনে মৌলিক পার্থক্য থাকা প্রয়োজন।
আনিস আলমগীর তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের অসন্তোষ বা আপত্তি প্রকাশের অধিকার রয়েছে, তবে সেই প্রকাশেরও নির্দিষ্ট রীতি ও সীমা আছে। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভাষা হতে হবে দায়িত্বশীল, পরিমিত এবং সুপরিকল্পিত। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা সংঘাতমুখী শব্দচয়ন অনেক সময় মূল বার্তার গুরুত্বকে আড়াল করে দেয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য বা বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এমন পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত ভাষা, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ধরন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কূটনৈতিক রীতিনীতির অনুসরণই একটি দেশের অবস্থানকে অধিক গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এ কারণেই সংযম, পেশাদারিত্ব, তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা—এসবই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।
মন্তব্য