কুড়িগ্রামে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সার বিতরণকে কেন্দ্র করে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। কোথাও কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করছেন, কোথাও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগ উঠছে। আবার কোনো কোনো স্থানে কর্মকর্তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। এতে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসন, বিএনপি নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে ডিলারের গুদামকেন্দ্রিক বিতরণের পরিবর্তে ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় একটি ডিলার পয়েন্টেই শত শত কৃষককে জড়ো হতে হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন ও ভিড়। অনেক কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
প্রশাসনের দাবি, ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণ চালুর জন্য কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহযোগিতা ও উদ্যোগের ঘাটতির কারণে সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুরে একটি ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ব্যাপক ভিড় হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) ঘটনাস্থল থেকে সরে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। প্রশাসন ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে গত রবিবার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ও ভোগডাঙা ইউনিয়নের ডিলার পয়েন্টগুলোতে সার বিতরণকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঘোগাদহে সার বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় ডিলারের গুদামের সামনে অপেক্ষমাণ কৃষকেরা এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে মারধর করে আহত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নে সার পাওয়ার দাবিতে কৃষকেরা ডিলারের গুদামে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। একই সঙ্গে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেন।
এর এক দিন আগে, ১৬ সেপ্টেম্বর চর রাজিবপুর উপজেলার রাজিবপুর বাজারে একটি ডিলারের গুদাম ভাঙচুর করে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা সেখান থেকে সার নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর রৌমারী এবং ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীতেও সার বিতরণকে কেন্দ্র করে একই ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিক এসব ঘটনায় কৃষি বিভাগের সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকদের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সার বিতরণ নিয়ে সমস্যা নতুন নয়, তবে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকায় বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
এক জায়গায় শত শত কৃষক
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত সার না পেয়ে বাড়ি ফিরছেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি দিনমজুরির কাজ করেন—এমন কৃষকদের জন্য ভোগান্তি আরও বেশি। সার সংগ্রহের জন্য একটি দিন নষ্ট হলে তাদের সরাসরি আয় কমে যায়।
তাদের মতে, ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হলে কৃষকদের এক জায়গায় জড়ো হতে হবে না। নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি দোকান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে ভিড় কমার পাশাপাশি সময় ও শ্রমও বাঁচবে।
মঙ্গলবার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজারে ‘মেসার্স মো. আকবর আলী’ নামে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা সার নেওয়ার জন্য সেখানে জড়ো হয়েছেন। পাঁচজন কৃষকের জন্য এক বস্তা সার দেওয়ার পরও অনেক কৃষক সার না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন বলেন, তিন দিন ধরে তিনি সার পাওয়ার জন্য ঘুরছেন। সারের জন্য বারবার আসতে গিয়ে তার কাজও নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, পাঁচজনের পরিচয়পত্র নিয়ে এলেও নিয়মের কারণে তা গ্রহণ করা হয়নি। অল্প পরিমাণ সার সংগ্রহের জন্য কৃষকদের দিনের কাজ বাদ দিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
একই ইউনিয়নের কৃষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সোলজার বলেন, আগে খুচরা দোকানের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার সংগ্রহ করা যেত। এখন একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তার মতে, আগের মতো খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের ব্যবস্থা চালু করা হলে কৃষকদের ভোগান্তি কমবে।
ডিলারদেরও একই অভিযোগ
বিসিআইসি সার ডিলার রমজান আলী বলেন, গত বছরও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হয়েছিল। এবার শুধু ডিলার পয়েন্টে সার দেওয়ার কারণে পুরো ইউনিয়নের কৃষকদের এক জায়গায় আসতে হচ্ছে। এতে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, ওয়ার্ডভিত্তিকভাবে সার বিতরণ করা হলে একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক কৃষকের সমাগম হতো না। ফলে বিতরণ প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে সহজ হতো।
উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটি এখনও চালু হয়নি। বর্তমানে ডিলারের গুদাম থেকেই সার দেওয়া হচ্ছে। অন্য উপজেলাগুলোতেও একই পদ্ধতিতে সার বিতরণের খবর পাওয়া গেছে।
সিদ্ধান্ত হলেও মাঠে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সার বিতরণ নিয়ে ধারাবাহিক বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়ার পর রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে আসেন। তিনি ওই দিন রৌমারীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরদিন জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের নিয়ে বৈঠক করেন।
বৈঠকে কৃষকদের সুবিধা এবং সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে ডিলারের গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি মাঠপর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি বৈঠকের সময়ও কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙা, ঘোগাদহ ও হলোখানা ইউনিয়নে ডিলারদের গুদামের সামনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা হামলার শিকার হন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেটি কার্যকর না হওয়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
কুড়িগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে মূল সংকট হিসেবে উঠে আসছে সার বিতরণের পদ্ধতি ও মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা। কৃষকদের এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে সীমিত পরিসরে সার দেওয়ার ফলে ভিড় বাড়ছে, অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হচ্ছে এবং উত্তেজনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের বৈঠকে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যার সমাধানও ঝুলে আছে।
কৃষকদের দাবি, সময়মতো ও সহজ পদ্ধতিতে সার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নেওয়া সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কার্যকর করে বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।









