নারী রেফারির সঙ্গে অসদাচরণ ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্যের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব কলম্বাস ক্রুর রিজার্ভ দলের কোচ ফেদেরিকো হিগুয়েইনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
এ ঘটনার সূত্রপাত এমএলএসের ডেভেলপমেন্ট লিগ ‘এমএলএস নেক্সট প্রো’-এর একটি ম্যাচে। ম্যাচ চলাকালে এক নারী রেফারির সঙ্গে হিগুয়েইনের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, রেফারির সঙ্গে হাত মেলানোর সময় তিনি তার হাত ধরে রাখেন এবং বারবার থামতে বলা হলেও হাত ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। একই ঘটনার পর তিনি ওই কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মনে রেখো, এটা পুরুষদের খেলা।’
ঘটনার সময় হিগুয়েইনকে লাল কার্ড দেখানো হয়। পরে লিগ কর্তৃপক্ষ তাকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে। তবে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। ঘটনার পর ক্লাব কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা ও অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কোচের দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কলম্বাস ক্রু।
ক্লাবটির জেনারেল ম্যানেজার ইসা তাল বলেন, ফেদেরিকো হিগুয়েইনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই ক্লাব, খেলোয়াড় এবং সহায়ক কর্মীদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত বলে তারা মনে করেছেন।
তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহের আলোচনার পাশাপাশি গত এক মাসের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেই পর্যালোচনায় ক্লাবের একটি দলের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ ও মানদণ্ড প্রত্যাশা করা হয়, হিগুয়েইন তা পূরণ করতে পারেননি বলে তারা মনে করেছেন।
ঘটনাটি নিয়ে পেশাদার সকার রেফারি অ্যাসোসিয়েশনও (পিএসআরএ) কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রেফারিদের সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, হিগুয়েইন ওই নারী কর্মকর্তার সঙ্গে দুটি ইচ্ছাকৃত শারীরিক আচরণ করেন এবং একই সঙ্গে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করেন। সংগঠনটি বলেছে, তিনজন ব্যক্তি তাকে থামতে বলার পরও তিনি রেফারির হাত ধরে রেখেছিলেন।
পিএসআরএর বিবৃতিতে বলা হয়, শারীরিক আচরণের পাশাপাশি ‘এটা পুরুষদের খেলা’ মন্তব্যটি ছিল অপমানজনক এবং লিঙ্গবৈষম্যমূলক। সংগঠনটির মতে, মাঠে দায়িত্ব পালনরত কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রাথমিকভাবে হিগুয়েইনকে দেওয়া দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তোলে পিএসআরএ। তাদের বক্তব্য, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় এই শাস্তি যথেষ্ট ছিল না। সংগঠনটি অন্তত ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছিল।
পিএসআরএ আরও বলেছে, ফুটবলের প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ খেলাটিকে সমৃদ্ধ করছে। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য নারী কর্মকর্তাদের হুমকি, অপমান বা অবমাননাকর মন্তব্যের মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়। বিশ্বমঞ্চেও নারী রেফারিরা নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করে সংগঠনটি তাদের জন্য অন্য কর্মকর্তাদের মতোই সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
এদিকে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর এক প্রতিবেদনে অজ্ঞাতনামা ক্লাব সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনাগুলোতে নিজের আচরণ নিয়ে হিগুয়েইন যথেষ্ট আত্মসমালোচনা বা দায় স্বীকার করতে আগ্রহ দেখাননি। এমনকি প্রকাশ্যেও তিনি ক্ষমা চাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে হিগুয়েইনের নিজস্ব বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ফেদেরিকো হিগুয়েইন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার। তিনি দেশটির জাতীয় পর্যায়ে খেলার পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তিনি সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা ও রিয়াল মাদ্রিদের প্রাক্তন ফরোয়ার্ড গনসালো হিগুয়েইনের ভাই। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়ে যুক্ত হয়ে কলম্বাস ক্রুর রিজার্ভ দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ক্লাবের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ঘটনাটির বিষয়ে তাদের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। মাঠে কোচ, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে এই ঘটনায়। বিশেষ করে নারী রেফারিদের অংশগ্রহণ বাড়ার সময়ে তাদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।









