জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৩২ পিএম

দেশের বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি হওয়া আটটি ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমে অনুমোদিত সীমার তুলনায় বহু গুণ বেশি বিষাক্ত ধাতু মার্কারি শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। পরীক্ষায় পাওয়া মাত্রা কোথাও কোথাও নির্ধারিত সীমার শতগুণেরও বেশি। এ ধরনের প্রসাধনী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই জানায়, বাজার থেকে বিভিন্ন ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর উদ্বেগজনক এই ফল পাওয়া গেছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর বিক্রি, বিতরণ, মজুদ ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের প্রযোজ্য মানদণ্ড বিডিএস-১৩৮২ অনুযায়ী প্রসাধনীতে মার্কারির সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১.০০ পিপিএম। কিন্তু বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় আটটি ক্রিমেই এই সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মার্কারি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি পণ্যে শনাক্ত হওয়া মাত্রা নির্ধারিত সীমার শতগুণেরও বেশি।
পরীক্ষায় পাকিস্তানের এস.জে. এন্টারপ্রাইজের ‘চাঁদনি হোয়াটেনিং ক্রিমে’ ১২০.৩৯ পিপিএম মার্কারি পাওয়া যায়। একই দেশের ক্রিয়েটিভ কসমেটিকসের ‘ডিউ বিউটি ক্রিমে’ শনাক্ত হয় ১২৩.৩৭ পিপিএম, যা পরীক্ষিত পণ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রা।
এ ছাড়া নুর এন্টারপ্রাইজের ‘নুর হোয়াটেনিং ক্রিমে’ ৮২.৭৬ পিপিএম, লোয়া ইন্টারন্যাশনালের ‘নাভিয়া হোয়াটেনিং ক্রিমে’ ৭৯.৭০ পিপিএম এবং একই প্রতিষ্ঠানের ‘নাভিয়া বিউটি ক্রিমে’ ৫৯.৮২ পিপিএম মার্কারি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের কিউসিআই কোম্পানির ‘নিউ ফেস বিউটি ক্রিমে’ ৪৪.৭২ পিপিএম এবং গৌরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেডের ‘গৌরি বিউটি ক্রিমে’ ৫৬.৯৩ পিপিএম মার্কারি শনাক্ত হয়েছে। চীনের জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকস কোম্পানির ‘ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিমে’ পাওয়া গেছে ৬৭.৪৯ পিপিএম মার্কারি।
বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, আটটি পণ্যের কোনোটিতেই মার্কারির পরিমাণ নির্ধারিত ১.০০ পিপিএম সীমার মধ্যে ছিল না। সবচেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া গেছে ‘ডিউ বিউটি ক্রিমে’, আর সবচেয়ে কম হলেও ‘নিউ ফেস বিউটি ক্রিমে’ শনাক্ত হওয়া মার্কারির পরিমাণ অনুমোদিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
| ক্রিমের নাম | উৎপাদক বা প্রতিষ্ঠান | দেশ | শনাক্ত মার্কারি |
|---|---|---|---|
| ডিউ বিউটি ক্রিম | ক্রিয়েটিভ কসমেটিকস | পাকিস্তান | ১২৩.৩৭ পিপিএম |
| চাঁদনি হোয়াটেনিং ক্রিম | এস.জে. এন্টারপ্রাইজ | পাকিস্তান | ১২০.৩৯ পিপিএম |
| নুর হোয়াটেনিং ক্রিম | নুর এন্টারপ্রাইজ | পাকিস্তান | ৮২.৭৬ পিপিএম |
| নাভিয়া হোয়াটেনিং ক্রিম | লোয়া ইন্টারন্যাশনাল | পাকিস্তান | ৭৯.৭০ পিপিএম |
| ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিম | জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকস কোম্পানি | চীন | ৬৭.৪৯ পিপিএম |
| গৌরি বিউটি ক্রিম | গৌরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেড | পাকিস্তান | ৫৬.৯৩ পিপিএম |
| নাভিয়া বিউটি ক্রিম | লোয়া ইন্টারন্যাশনাল | পাকিস্তান | ৫৯.৮২ পিপিএম |
| নিউ ফেস বিউটি ক্রিম | কিউসিআই কোম্পানি | পাকিস্তান | ৪৪.৭২ পিপিএম |
বিএসটিআই জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন বিদেশি ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের চাহিদা ও বিক্রি বেড়েছে। এসব পণ্যের একটি অংশ বৈধ আমদানি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে যাত্রীদের লাগেজ বা চোরাইপথে দেশে প্রবেশ করছে বলে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ। ফলে আমদানির সময় নিয়মিত মান যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়াই এসব প্রসাধনী বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বৈধ আমদানি ও মান নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও উপাদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। এ কারণেই বাজারে বিক্রি হওয়া সন্দেহজনক প্রসাধনীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসটিআই।
সংস্থাটির মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। ভোক্তাদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিএসটিআইয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে বিএসটিআই নিয়মিতভাবে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ, বাজার তদারকি, সার্ভিল্যান্স এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন পণ্য শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মার্কারি বা পারদ একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত মার্কারির সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ত্বকে ব্যবহারের জন্য তৈরি প্রসাধনীতে অতিরিক্ত মার্কারি থাকলে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ধরনের পণ্য ব্যবহারে ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া, জ্বালা, অ্যালার্জি, স্থায়ী দাগ এবং অন্যান্য চর্মসমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ঝুঁকি শুধু ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে শরীরে মার্কারি জমে কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। স্মৃতিশক্তি, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত মার্কারির সংস্পর্শ অনাগত শিশুর বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে থাকেন। তাই গর্ভাবস্থায় অজ্ঞাত উৎসের বা অননুমোদিত প্রসাধনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বিএসটিআই ভোক্তাদের বাজার থেকে এসব পণ্য কেনা ও ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত উৎসের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম কেনার আগে পণ্যের বৈধতা ও অনুমোদন যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদেরও সন্দেহজনক বা অবৈধভাবে আমদানি করা প্রসাধনী মজুদ ও বিক্রি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মন্তব্য