বগুড়া প্রতিনিধি:
বগুড়া সদর উপজেলার ঠেঙ্গামারা সীমান্তবর্তী নদীর তীরবর্তী জঙ্গলঘেরা এক দুর্গম আস্তানায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদকচক্রকে গুড়িয়ে দিয়েছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে চক্রের মূল হোতাসহ তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, উদ্ধারকৃত নগদ টাকা, বিভিন্ন মাদকদ্রব্য এবং অপহরণের পর জিম্মিদের ওপর নৃশংস শারীরিক নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত ২৫ হাজার ভোল্টের একটি বৈদ্যুতিক শকার যন্ত্র জব্দ করেছে পুলিশ।
জেলা ডিবি পুলিশ সূত্রের ভাষ্যমতে, অপরাধীরা বগুড়া সদর উপজেলার ঠেঙ্গামারা এলাকার কাছে বহমান করতোয়া নদীর পেছনের জঙ্গলকীর্ণ ও নির্জন স্থান বেছে নিয়েছিল। সেখানে একটি পেপার মিলের আড়ালে পেছনের দুর্গম স্থানে তাঁবু ও পলিথিন টাঙিয়ে আস্তানা গেড়েছিল চক্রটি। পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল ওই গোপন আস্তানায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
ডিবি পুলিশ আস্তানায় ঘেরাও অভিযান শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে চক্রের আরও প্রায় পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য করতোয়া নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে চক্রের দুই মূল কারিগর রকি ও রাকিবসহ মোট তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়।
ঘটনাস্থল অনুসন্ধানের পর পুলিশ যেসব আলামত জব্দ করেছে, তা চক্রটির মারাত্মক ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির অপরাধচিত্র ফুটিয়ে তোলে। উদ্ধার করা মালামালের মধ্যে রয়েছে:
একটি প্রসংখ্যাত বিদেশি রিভলবার
৩টি প্রকাণ্ড চায়নিজ কুড়াল
১টি ধারালো চাপাতিসহ বেশ কিছু দেশীয় মারাত্মক অস্ত্র
বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য
মাদক বিক্রির নগদ টাকা
২৫,০০০ ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চশক্তির একটি ইলেকট্রিক শকার
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে করতোয়ার তীরের দুর্গম আস্তানা থেকে পুরো এলাকায় সুসংগঠিতভাবে নানা অপকর্ম পরিচালনা করছিল। তারা মূলত সীমান্ত ও নদীবেষ্টিত ওই এলাকা থেকে বিস্তৃত মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করত। এর পাশাপাশি নির্জন স্থানে পথচারী কিংবা টার্গেট করা ব্যক্তিদের অপহরণ করে আস্তানায় আটকে রাখা হতো। সেখানে বন্দি ব্যক্তিদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য ২৫ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক শকার দিয়ে নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগে প্রকাশ পেয়েছে।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক ইকবাল বাহার জানান, গ্রেপ্তারকৃত রকি ও রাকিব এলাকার চিহ্নিত অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই বিভিন্ন থানায় অস্ত্র, অনিয়ন্ত্রিত মাদক এবং ফেনসিডিল সংক্রান্ত একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন অপরাধে তারা পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হলেও আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে বের হয়ে আসে। জামিনে আসার পর লোকালয়ে নজরদারি এড়াতে নদী তীরবর্তী দুর্গম জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে নতুন করে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে তারা।
ইন্সপেক্টর ইকবাল বাহার আরও জানান, অভিযানের সময় নদী সাঁতরে পালিয়ে যাওয়া বাকি পাঁচ থেকে সাতজন সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, মাদকনিয়ন্ত্রণ আইন এবং অপহরণের ধারায় নতুন করে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং এই বাহিনীর মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে ডিবি পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।









