জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:২৮ পিএম

ভারতীয় ক্রিকেট দলের আসন্ন বাংলাদেশ সফর নিশ্চিত করতে এবার সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরে দুই দলের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বিসিবি আশাবাদী। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সম্মতি এখনো না আসায় সফরটি নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটছে না। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেট প্রশাসনের পাশাপাশি দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগও বাড়াতে চাইছে বিসিবি।
ক্রিকেটবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এবং বোর্ডের নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান সাইয়েদ ইব্রাহিম পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশ সফর নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিসিবি সভাপতি বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনায় ঠিক কী কী বিষয় উঠে এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি। তবে বৈঠকের সময় ও প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যাচ্ছে, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সিরিজটি আয়োজনের ক্ষেত্রে বিসিবি এখন সরকারি পর্যায়ের সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
সূচি অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে ছয় ম্যাচের এই সীমিত ওভারের সিরিজটি দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সফরটি বাস্তবে রূপ দিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন। সেই সিদ্ধান্ত এখনো না আসায় সিরিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে।
গত ২৯ জুলাই বিসিবি সভাপতি জানিয়েছিলেন, ভারত সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বোর্ড আশাবাদী। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে ইঙ্গিত ছিল, সফরটি চূড়ান্ত করার কিছু বিষয় বিসিবির সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে ক্রিকেট প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ ও সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। এক দিন পরই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে কিছুটা জটিলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে দুই দলের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে সিরিজটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের মধ্যে তৈরি হওয়া জটিলতা এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতির কারণে বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ক্রিকেটের মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতাও দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, সফরসূচি ও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এ কারণে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরকে শুধু একটি সাধারণ দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সিরিজ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের পরিবেশও কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক বার্তার কথাও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত সরকার। একই সময়ে ২৯ জুলাই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকা ও নয়াদিল্লি একমত হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এমন উদ্যোগ ক্রিকেট অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের সিদ্ধান্ত সাধারণত দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সমন্বয়ের মাধ্যমেই নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কোনো পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, ভ্রমণ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক পরিবেশ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সফর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিসিবির নতুন পরিচালনা পর্ষদ দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী—সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে এলে তা দুই দেশের ক্রিকেটারদের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসনের সম্পর্কেও নতুন গতি আনতে পারে।
এখন সবার নজর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে। বিসিবি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং সফরটি বাস্তবায়নে সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা, ক্রিকেট প্রশাসনের যোগাযোগ এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সফরের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে সেপ্টেম্বরে পরিকল্পিত ছয় ম্যাচের সাদা বলের সিরিজ মাঠে গড়াবে কি না। বিসিবির প্রত্যাশা, সরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক ইতিবাচক আবহ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সিরিজটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পাবে।
মন্তব্য