জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:২ পিএম

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ১৩ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী ও এক তরুণকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ, উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিকভাবে অপমানিত ও হেয় হওয়ার আশঙ্কা এবং মানসিক যন্ত্রণায় ওই স্কুলছাত্রী বিষ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে সে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই দুপুরে কাশিয়ানী উপজেলার একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের শিকার স্কুলছাত্রীটি ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বয়স ১৩ বছর। একই ঘটনায় এক তরুণকেও বিদ্যালয়ে এনে ওই ছাত্রীর সঙ্গে একটি গাছের সঙ্গে গামছা দিয়ে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিন ওই ছাত্রী ও তরুণকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখার অভিযোগ ওঠে। এর পরদিন তাঁদের দুজনকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ছাত্রীটিকে বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে এবং তরুণকে তাঁর বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের দুজনকে বিদ্যালয়ের ভেতরে একটি দেবদারুগাছের সঙ্গে একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় কয়েকজনের উপস্থিতিতে তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন মোবাইল ফোনে পুরো বা আংশিক ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার রাতে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরিবারের দাবি, ভিডিওটি প্রকাশ্যে চলে আসার পর স্কুলছাত্রীটি তীব্র মানসিক চাপে পড়ে। একপর্যায়ে সে বিষ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষপানের পর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটলেও ঘটনার পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো শিক্ষার্থী বা তরুণের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা উচিত ছিল। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরিবর্তে কেন তাঁদের প্রকাশ্যে অপমান ও নির্যাতনের শিকার হতে হলো। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে জনসমক্ষে হেনস্তা করা তার মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
এ ঘটনায় নয়ন বাড়ৈ, জয় শিকদার, মিশন রায়সহ আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নয়ন বাড়ৈ। তাঁর দাবি, ওই দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পাওয়ার পর এলাকার কয়েকজন যুবক তাঁদের তাঁর বাড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে তিনি তাঁদের বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে অভিভাবকদের কাছে তুলে দেন। তবে তাঁদের গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিত সরকার জানান, ঘটনার দিন তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিও ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বলে জানান তিনি। সভাপতি ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন।
কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান জানান, এ ঘটনায় থানায় এখনো কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি শুধু একটি নির্যাতনের অভিযোগ নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অভিযোগ মোকাবিলার যথাযথ পদ্ধতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কোনো ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে প্রকাশ্যে অপমান বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই।
আর একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা রক্ষায় পরিবার, বিদ্যালয় এবং প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা কী ছিল এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভিডিও ধারণ ও তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে এলাকাবাসীর।
মন্তব্য