জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৫:১৬ পিএম

কলম্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ৩৩ বছর বয়সী বামপন্থী রাজনীতিক দেইসি আলেজান্দ্রা ওমানা অর্টিজ। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করা, সেখান থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে সিনেটর হিসেবে শপথ নেওয়া—তাঁর এই ব্যতিক্রমী পেশাগত যাত্রা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় স্থানীয় সময় গত সোমবার বামপন্থী রাজনৈতিক দল হিস্টোরিক প্যাক্ট ফর কলম্বিয়ার হয়ে সিনেটর হিসেবে শপথ নেন দেইসি। এর আগে গত মার্চে দেশটির নর্তে দে সান্তান্দার অঞ্চল থেকে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, অতীত পেশা এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে বক্তব্য ঘিরে জনপরিসরে বিতর্ক আরও জোরালো হয়।
দেইসির পেশাজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। ২০১৭ সালে তিনি সেই পেশা ছেড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে যোগ দেন। ওই জগতে তিনি ‘আমারান্তা হাঙ্ক’ নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে এই পেশায় তাঁর সময় দীর্ঘ হয়নি। প্রায় দুই বছর পর তিনি ক্যামেরার সামনে কাজ করা থেকে সরে এসে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নির্বাচনের মাঠে নামেন।
তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কর্মরত মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে অবস্থান। দেইসির মতে, এই খাতে কাজ করা অনেক মানুষ শোষণ, বৈষম্য এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে বিভিন্ন কোম্পানি ও এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীদের অধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের সুরক্ষা দিতে কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছেন।
সিনেট নির্বাচনের প্রচারণার সময় দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় দেইসি বলেন, ভুয়া তথ্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক দ্বিচারিতার কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে যুক্ত নারীরা দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজে এই শিল্পের বিষয়বস্তু গ্রহণযোগ্যতা পেলেও এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। তাই শিল্পটির বাস্তবতা স্বীকার করে কর্মীদের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে তাঁর নির্বাচনী প্রার্থিতা সবাই সহজভাবে মেনে নেয়নি। সমালোচকদের একাংশের যুক্তি ছিল, অতীতে পর্নোশিল্পে কাজ করা কোনো ব্যক্তির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া উচিত নয়। দেইসি অবশ্য এই আপত্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন—কেউ যদি প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করে থাকেন, তাহলে কি তাঁর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার অধিকার থাকবে না?
নিজের অবস্থানের পক্ষে দেইসি ইতালির সাবেক আইনপ্রণেতা ইলোনা স্টালারের উদাহরণও দিয়েছেন। ‘সিকিওলিনা’ নামে পরিচিত স্টালার একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করেছেন এবং পরে ইতালির পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। দেইসির যুক্তিতে এই উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর মতে, একজন মানুষের অতীত পেশা দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা কিংবা জনসেবার সক্ষমতা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
দেইসির রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, বৈষম্য এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, তাঁর নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা সমাজের কিছু বাস্তবতা কাছ থেকে বোঝার সুযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ সামাজিক কলঙ্ক, বৈষম্য কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক আলোচনায় আরও বেশি জায়গা পাওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
এই জায়গাতেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা একটি বৃহত্তর সামাজিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দেইসির বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজ একদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পের বিভিন্ন উপাদান গ্রহণ করে, অন্যদিকে সেই শিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে সহজে মেনে নিতে চায় না। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই দ্বৈত মানসিকতা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের অধিকারকে নীতিনির্ধারণের আলোচনায় আনা।
তবে দেইসির রাজনৈতিক কর্মসূচি শুধু এই শিল্পে কর্মরত মানুষের অধিকারকেন্দ্রিক নয়। তিনি মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পাশাপাশি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি সোচ্চার। এসব ইস্যুকে তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখেন।
দেইসির সিনেটর নির্বাচিত হওয়া তাই কেবল একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত ও ব্যতিক্রমী পেশাগত পরিবর্তনের গল্প নয়। এর মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার সমাজে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মানুষের অতীত পেশার ভিত্তিতে তাঁর মূল্যায়ন করা উচিত কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সাংবাদিকতা থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্প, এরপর সক্রিয় রাজনীতি এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পৌঁছানো দেইসির যাত্রা প্রচলিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বাইরে একটি ভিন্ন পথের উদাহরণ। তবে এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো অতীত পেশাকে ঘিরে বিতর্কের বাইরে গিয়ে একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখা। ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ, নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সামাজিক অধিকারসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে আইন ও নীতিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য