জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৩:৫৪ পিএম

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী সৈকতের কাছে একটি খালি মাঠ থেকে আবদুল আজিজ (২৭) নামের এক হোটেল কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন থাকায় ঘটনাটি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আবদুল আজিজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার পর মরদেহ নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে। তবে পুলিশ এখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে ইনানী সৈকতের পূর্ব পাশে অবস্থিত পাঁচতারকা হোটেল বে-ওয়াচের স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের একটি খালি জায়গায় আবদুল আজিজের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য তা কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিহত আবদুল আজিজ উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা রশিদ আহমদের ছেলে। তিনি প্রায় এক বছর ধরে বে-ওয়াচ হোটেলে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল হোটেলের গরুর খামার দেখাশোনা ও পরিচর্যা করা। কর্মস্থলের কাছেই হোটেলের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন তিনি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, রাত সোয়া ১২টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। পরে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন দেখা গেছে। তবে এসব আঘাত কীভাবে হয়েছে এবং সেগুলো মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
নিহতের স্ত্রী সায়কা ইয়াছমিন জানান, মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে আবদুল আজিজ কর্মস্থলে ফিরে যান। পরদিন বুধবার বেলা ১১টার দিকে মুঠোফোনে স্বামীর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রাতে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, হোটেলের স্টাফ কোয়ার্টারের পাশের মাঠে আজিজের মরদেহ পড়ে আছে। রাত একটার দিকে খবরটি জানার পর থেকেই পরিবারের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক নেমে আসে।
পরিবারের সদস্যদের ধারণা, আবদুল আজিজকে মারধর অথবা শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মরদেহ ঘটনাস্থলে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে পরিবারের এই অভিযোগ এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশও হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের ফল এবং তদন্তের তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আজিজের স্বজনেরা ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, যদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার পেছনে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনেরও দাবি জানানো হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী সায়কা ইয়াছমিন বলেন, তাঁদের সংসারে তিনটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়েই তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সোলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আবদুল আজিজ ছিলেন পরিশ্রমী এক যুবক। তাঁর মৃত্যু যেহেতু রহস্যজনক এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা থাকলে দ্রুত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, হোটেলের স্টাফ কোয়ার্টার এবং আশপাশের এলাকায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আজিজ মৃত্যুর আগে কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন কিংবা তাঁর সঙ্গে শেষ সময়ে কারা ছিলেন—এসব তথ্য উদ্ঘাটনে ক্যামেরার ফুটেজ সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে বে-ওয়াচ হোটেলের উপমহাব্যবস্থাপক এনায়েত উল্লাহ জানান, আবদুল আজিজ হোটেলের গরুর খামার দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুর ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
পুলিশের তদন্তে বর্তমানে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আজিজের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, তাঁর শরীরে পাওয়া আঘাতের চিহ্ন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং মৃত্যুর আগে তিনি কোথায় ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, হোটেল ও স্টাফ কোয়ার্টারের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হতে পারে।
তদন্তকারীরা আজিজের শেষ যোগাযোগ, কর্মস্থলে তাঁর গতিবিধি এবং মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, সেসব তথ্যও খতিয়ে দেখতে পারেন। তবে তদন্তের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নিহতের পরিবার জানিয়েছে, এ ঘটনায় তারা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সম্ভাব্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। আবদুল আজিজের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা—এখন সেটিই পরিবারের প্রধান দাবি।
মন্তব্য