জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুলাই ২০২৬, ৮:২৩ পিএম

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা চার দশকের। ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এরপর সময় গড়িয়েছে, ক্রিকেট অবকাঠামো বদলেছে, এসেছে একাধিক প্রজন্মের ক্রিকেটার। কিন্তু দীর্ঘ এই পথচলায় এখনো বড় কোনো বৈশ্বিক শিরোপা জিততে পারেনি লাল-সবুজের দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও পৌঁছানো হয়নি। এশিয়া কাপের মঞ্চে তিনবার ফাইনালে উঠেও শিরোপা অধরা থেকেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই দীর্ঘ যাত্রায় সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি চলেছে। ওয়ানডে বিশ্বকাপে একাধিকবার নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। টি-টোয়েন্টিতেও ধারাবাহিকতার অভাব দলকে ভুগিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে কিছু উল্লেখযোগ্য জয় এলেও দীর্ঘ সময় ধরে তিন ফরম্যাটে একইসঙ্গে শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন পরিস্থিতির পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তবে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তিন ফরম্যাটে একসময় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত সাকিব আল হাসানের মতে, বড় একটি দুর্বলতা রয়েছে দলের বেঞ্চ শক্তিতে। অর্থাৎ, নিয়মিত একাদশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো খেলোয়াড় চোটে পড়লে কিংবা বিশ্রামের কারণে বাইরে থাকলে তাঁর মানসম্পন্ন বিকল্প তৈরি করা এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ দলের বর্তমান সামর্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাকিব বলেন, তিন ফরম্যাটেই দলের মূল একাদশ যথেষ্ট ভালো। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন একসঙ্গে কয়েকজন নিয়মিত ক্রিকেটারকে পাওয়া যায় না। তাঁর ভাষায়, সেরা একাদশ বিবেচনায় বাংলাদেশ তিন ফরম্যাটেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো দল গড়তে পারে। কিন্তু চোট, বিশ্রাম কিংবা নিয়মিত রোটেশনের কারণে কয়েকজন খেলোয়াড় বাইরে থাকলে দলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাকিবের এই মন্তব্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের একটি আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিতে এখন ক্রিকেটারদের বিশ্রাম ও রোটেশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই খেলোয়াড়কে তিন ফরম্যাটে নিয়মিত খেলানো সব সময় সম্ভব হয় না। আবার চোটের কারণে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার ছিটকে গেলে তাঁর জায়গায় একই মানের বিকল্প না থাকলে দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে। শক্তিশালী বেঞ্চ তাই শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়, বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সাকিব। একসময় দেশের ক্রিকেটে পেস বোলিং ছিল তুলনামূলক দুর্বল একটি জায়গা। তবে গত কয়েক বছরে এই বিভাগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একাধিক তরুণ ও গতিময় পেসার উঠে আসায় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র্য বেড়েছে। দেশের বাইরে কঠিন কন্ডিশনেও পেসারদের কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা আগের তুলনায় দৃশ্যমান হয়েছে।
সাকিবের মতে, এই উন্নতি এক দিনে আসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার ফলেই বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগ বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সামনে দেশের পেসাররা আরও উন্নতি করবেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করবেন।
তবে পেস বোলিংয়ে উন্নতি এলেও সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি করা জরুরি। নিয়মিত একাদশের বাইরে থাকা পেসারদের আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার সুযোগ এবং চোট থেকে ফিরে আসা খেলোয়াড়দের পুনর্বাসন—সবকিছুর ওপরই নজর দিতে হবে। একই বিষয় প্রযোজ্য ব্যাটিং ও স্পিন বিভাগেও।
বর্তমান বাংলাদেশ দলে সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের সংখ্যা নিয়েও ইতিবাচক সাকিব। তাঁকে যখন দলের ভবিষ্যৎ তারকা বা সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি নির্দিষ্ট একজন বা দুজনের নাম বলতে চাননি। তাঁর মতে, দলে অনেক ক্রিকেটারেরই সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ সবারই আছে।
সাকিবের বক্তব্যে তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে শক্তিশালী মূল একাদশ, অন্যদিকে রয়েছে পর্যাপ্ত বিকল্প খেলোয়াড় তৈরির প্রয়োজনীয়তা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া একটি দলের জন্য এই বেঞ্চ শক্তি এখন বড় পরীক্ষার জায়গা। কারণ বড় টুর্নামেন্টে সাফল্য পেতে শুধু সেরা একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডের সামর্থ্যই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
চার দশকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিভার অভাবকে আর একমাত্র সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের ধারাবাহিকভাবে তৈরি করা, তাঁদের আন্তর্জাতিক মানে প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনের সময় মূল দলের সমান কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। সাকিবের মন্তব্য সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
মন্তব্য