জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুলাই ২০২৬, ৭:৪৪ পিএম

দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। বহু প্রতীক্ষার পর পাওয়া এই সফরটি তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে মাঠে নামার আগেই একের পর এক চোটের ধাক্কায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। পূর্ণ শক্তির স্কোয়াড নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করার যে পরিকল্পনা ছিল, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিতে সেই হিসাব এখন অনেকটাই বদলে গেছে। তবু হতাশ হয়ে পিছিয়ে যেতে রাজি নয় বাংলাদেশ। বরং কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে সম্মান নিয়ে দেশে ফেরাই এখন দলের অন্যতম লক্ষ্য।
অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে তরুণ সদস্য পেসার মুশফিক হাসান। টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণের জন্মের পরের বছরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের সেই সফরে দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়েছিল টাইগারদের। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ হয়নি বাংলাদেশের। দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই অপেক্ষার অবসান হলেও এবারের সফরের আগে চোটের কারণে দলকে নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে নেই অভিজ্ঞ ব্যাটার লিটন দাস ও পেসার শরিফুল ইসলাম। আরও বড় ধাক্কা এসেছে নাহিদ রানাকে পুরো সিরিজের জন্য হারিয়ে। তরুণ এই গতিময় পেসারের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে লিটনের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারকে না পাওয়ায় ব্যাটিং বিভাগেও চাপ বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশনে যেখানে অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের চোট দলের পরিকল্পনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলেছে।
তবে পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে দেখতে চান না প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। মিরপুরে প্রথম টেস্টের দল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরিষ্কার করেছেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু ম্যাচের ফল নয়; অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলে সম্মান নিয়ে ফেরাও গুরুত্বপূর্ণ।
হাবিবুল বাশার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে যে ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ দল ও প্রস্তুতি প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেই অবস্থানেই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে দলের পারফরম্যান্সও ছিল বেশ ধারাবাহিক। কিন্তু সফরের ঠিক আগে চোটের কারণে পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। নির্বাচকেরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন, অন্তত একজন চোটগ্রস্ত খেলোয়াড় কোনো একটি টেস্টে ফিরতে পারেন কি না। শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়নি।
চোটের ধাক্কা থাকলেও হাতে থাকা খেলোয়াড়দের নিয়েই নতুন পরিকল্পনায় এগোতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। নির্বাচকদের বিশ্বাস, যারা এখন সুস্থ ও প্রস্তুত, তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভালো ক্রিকেট উপহার দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে ব্যাটিং। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটারদের ধারাবাহিক রান না পাওয়া দলের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজেও ব্যাটিং ব্যর্থতা বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন বলের চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত বাউন্স এবং দ্রুতগতির বোলিং সামলাতে ব্যাটারদের বড় পরীক্ষা দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন সৌম্য সরকার। ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করা অনেক তরুণ ব্যাটার থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন সফরে তাঁদের সরাসরি খেলানোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে নির্বাচক প্যানেল। অভিজ্ঞ ওপেনার হিসেবে সৌম্যকে দলে নেওয়ার পেছনে সেটিই অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক। তাঁর প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, দলের ব্যাটিং পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।
একসঙ্গে একাধিক পেসারের চোটে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নাহিদ রানাকে সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাচে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রধান নির্বাচকের ব্যাখ্যা, একজন ফাস্ট বোলারের ক্ষেত্রে শুধু বেশি বোলিং করাই ঝুঁকির কারণ নয়; দীর্ঘ সময় একেবারে কম বোলিং করলেও ম্যাচের প্রস্তুতি ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নির্দিষ্ট মাত্রায় বোলিংয়ের মাধ্যমে একজন পেসারকে প্রস্তুত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নাহিদের চোট পাওয়া দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করেন তিনি।
সব প্রতিকূলতা মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য কঠিন এক পরীক্ষা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, ভিন্ন কন্ডিশন এবং চোটের ধাক্কা—সবকিছু সামলে দলকে নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে হবে। ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি লড়াইয়ের মান, ব্যাটারদের দৃঢ়তা, পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং কঠিন পরিস্থিতিতে মানসিক শক্তি ধরে রাখাও হবে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় মাপকাঠি।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরেছে বাংলাদেশ। এবার সেই প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখার দায়িত্ব মাঠে থাকা ক্রিকেটারদের। নির্বাচকদের প্রত্যাশা একটাই—প্রতিকূলতা যতই থাকুক, দল যেন শেষ পর্যন্ত লড়াই করে এবং সম্মান নিয়েই দেশে ফেরে।
মন্তব্য