খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুলাই ২০২৬, ৪:৯ পিএম

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ার পর আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে ঘিরে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ফাইনালে তাঁর প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স না পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফুটবল মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব সমালোচনার সঙ্গে একমত নন ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি।
তাঁর মতে, একটি ম্যাচ, এমনকি বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ফাইনালের পারফরম্যান্স দিয়েও মেসির মতো একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের পুরো ক্যারিয়ারকে মূল্যায়ন করা যায় না। গাঙ্গুলির যুক্তি, বিশ্বের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দেরও খারাপ দিন আসতে পারে। একজন খেলোয়াড় যত বড়ই হোন, প্রতিটি ম্যাচে একই মানের পারফরম্যান্স করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসির সমালোচকদের উদ্দেশে গাঙ্গুলি বলেন, লিওনেল মেসির উত্তরাধিকার কোনোভাবেই একটি ম্যাচের ওপর নির্ভর করে বিচার করা উচিত নয়। তাঁর মতে, মেসিও একজন মানুষ এবং তাঁরও ব্যর্থতা বা খারাপ দিন থাকতে পারে। একটি ফাইনাল কিংবা একটি ম্যাচে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স না পাওয়ার কারণে তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণিল ক্যারিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অন্যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপের পুরো আসরজুড়েই মেসি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে বিবেচিত এই আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। টুর্নামেন্টের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নিজের পরিচিত ছন্দে দেখা যায়নি ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে।
স্পেনের রক্ষণভাগের সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্স মেসির জন্য জায়গা তৈরি করা কঠিন করে তোলে। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগও পুরো ম্যাচে নিজেদের স্বাভাবিক গতি ও কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি। ফলে ম্যাচ শেষে মেসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে গাঙ্গুলির দৃষ্টিতে, এই ব্যর্থতার দায় শুধু মেসির ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন ভারতের সাবেক এই ক্রিকেট অধিনায়ক। তাঁর মতে, তরুণ ও উদ্যমী স্পেনের বিপক্ষে কৌশলগত লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা কিছুটা পিছিয়ে ছিল। ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন এমনভাবে খেলেছে, যাতে আর্জেন্টিনা তাদের পরিচিত ছন্দে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি।
গাঙ্গুলি বলেন, তিনি বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ দেখেননি। তবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচ তাঁর দেখা হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ফাইনালে স্পেন শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে দেয়নি। কৌশলগত দিক থেকে স্পেনকে তাঁর কাছে বেশি প্রস্তুত ও কার্যকর মনে হয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্যের কথাও। কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর কোপা আমেরিকার সাফল্য এবং এবার আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া—গাঙ্গুলির মতে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক শক্ত অবস্থানেরই প্রমাণ।
বিশ্বকাপের ফাইনালে হারলেও শেষ দুই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে স্পষ্ট করেছে। একটি দল দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ পর্যায়ে থাকতে চাইলে শুধু একজন তারকার ওপর নির্ভর করলেই হয় না; প্রয়োজন শক্তিশালী দলীয় কাঠামো, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। আর্জেন্টিনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ক্ষেত্রেই নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে।
এদিকে মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা চলছে। ৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর তিনি জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন কি না, তা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। তবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
গাঙ্গুলির বক্তব্যের মূল সুর অবশ্য পরিষ্কার—মেসির মতো একজন খেলোয়াড়ের মূল্যায়ন একটি ম্যাচের ফল বা একটি ফাইনালের পারফরম্যান্স দিয়ে করা উচিত নয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর অর্জন, ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ব ফুটবলে প্রভাবই তাঁর উত্তরাধিকারের প্রকৃত মাপকাঠি।
সৌরভ গাঙ্গুলির মতে, ফাইনালে পৌঁছানোই আর্জেন্টিনার জন্য বড় অর্জন। ফুটবলে শেষ পর্যন্ত একটি দল জিতবে, অন্য দলকে হার মেনে নিতে হবে—এটাই প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক নিয়ম। তাই একটি পরাজয় কিংবা একটি খারাপ ম্যাচ মেসির অসাধারণ ক্যারিয়ারের মূল্য কোনোভাবেই কমিয়ে দিতে পারে না।
মন্তব্য