খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ১১:৫ পিএম

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের দাবিতে তরুণদের গড়ে তোলা আন্দোলন এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। শুরুতে এটি কেবল শিক্ষাঙ্গনের নানা দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র বেকারত্ব, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি জবাবদিহিতার দাবি। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি সামাজিক ও নাগরিক উদ্যোগের অধীনে শুরু হওয়া এই গণবিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের এই জাগরণ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য এক তীব্র রাজপথের সংকট ও রাজনৈতিক বিপদঘণ্টা হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আন্দোলনটির গতিপ্রকৃতি। সম্প্রতি দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার ডাক দিলে পুরো অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। রাজপথ ও আশপাশের এলাকাগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণী জড়ো হতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন মেট্রো সেবা আংশিক বন্ধ করে এবং চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এমনকি জনসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে, তবে প্রগতিশীল তরুণদের প্রতিরোধ এবং অবস্থান থেকে পিছু হটানো সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষ ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে টানা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছে সিজেপি। নামের শেষে ‘পার্টি’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও সংগঠনটি কোনো প্রথাগত বা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত তরুণ প্রজন্মের একটি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক উদ্যোগ। এতদিন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের শক্ত অবস্থানের কথা শোনা গেলেও সাম্প্রতিক রাজপথের বিশাল জনসমাগম প্রমাণ করেছে যে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এদের শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে।
স্বাধীন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্মিতা শর্মা জানান, এই অভূতপূর্ব বিক্ষোভের মাধ্যমে ভারতের তরুণ সমাজ রাষ্ট্রকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে। শিক্ষা খাতের অনিয়ম ছাড়াও কর্মসংস্থানহীনতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলোকে সরকার আর হালকাভাবে নিতে পারবে না।
আন্দোলনের মুখে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধ দলের সঙ্গে এক আলোচনায় বসেন। পরে আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। তবে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি মানার ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণায় অটল রয়েছে সিজেপি।
বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ যোগেন্দ্র যাদব এই আন্দোলন সম্পর্কে বলেন, তরুণদের এই প্রতিবাদ কেবল নিজেদের তাৎক্ষণিক স্বার্থরক্ষার আন্দোলন নয়। বরং তারা এমন একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি এবং স্বচ্ছ রাজনীতির দাবি তুলছে যা পুরো ভারতের ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত আত্রির মতে, রাজপথের এই নতুন বার্তা মোদি সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। সাধারণ মানুষের মূল দুশ্চিন্তা এখন জীবিকা, শিক্ষা ও অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি, যাতায়াতব্যবস্থায় বাধা কিংবা ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তরুণদের এভাবে সংগঠিত হওয়া প্রমাণ করে যে জমে থাকা অসন্তোষ চরম রূপ নিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তরুণদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে দীর্ঘমেয়াদে উপেক্ষা করা সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য