খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ১০:১১ পিএম

প্যাসিফিক (প্রশান্ত মহাসাগরীয়) অঞ্চলে বাণিজ্যিক বীমার প্রিমিয়াম রেট বা কিস্তি ধারাবাহিকভাবে কমলেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি। বিশ্বখ্যাত বীমা ব্রোকারেজ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মার্শ (Marsh)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (Q1) প্যাসিফিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক বীমার রেট গড়ে ১২% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এটি বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে অনুকূল নবায়ন (Renewal) বা পলিসি নবায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে প্রিমিয়াম কমে যাওয়ার এই সাময়িক স্বস্তি বাস্তবে ‘আন্ডার-ইন্স্যুরেন্স’ বা ‘স্বল্প-বীমা’ (Underinsurance) ঝুঁকিকে ঢেকে রাখছে। সার্বিক বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মূলধনী সম্পদের পুনঃনির্মাণ ও প্রতিস্থাপন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান বীমা কভারেজ ও সম্পত্তির প্রকৃত মূল্যের মধ্যে এক বিরাট বিপজ্জনক ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
যদিও বাণিজ্যিক বীমা নেওয়ার খরচ কিছুটা সহজ হয়েছে, তবে সার্বিক ম্যাক্রো-অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখনো বেশ উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে:
অস্ট্রেলিয়ার মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি: ২০২৬ সালের মার্চ সমাপ্ত প্রান্তিকে অস্ট্রেলিয়ার গ্রাহক মূল্য সূচক (CPI) মূল্যস্ফীতি ৪.৬%-এ পৌঁছায়, যা মে মাসে সামান্য কমে ৪.০%-এ নেমে আসে। কিন্তু দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (RBA)-এর প্রিয় সূচক ‘ট্রিমড মিন’ (Trimmed mean) বা মূল মূল্যস্ফীতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে ৩.৬% হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের চিত্র: ২০২৬ সালের মার্চে সমাপ্ত বছরে নিউজিল্যান্ডের সিপিআই মূল্যস্ফীতি ৩.১% রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশটির সেন্ট্রাল ব্যাংকের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার ওপরে।
নির্মাণ খাতের অগ্নিমূল্য: প্যাসিফিক অঞ্চলের নির্মাণ খাতে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৬%-এ পৌঁছানোর জোরালো পূর্বাভাস রয়েছে। কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত এবং দক্ষ নির্মাণ শ্রমিকের চরম সংকট এই খাতকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকটাই বেড়েছে। যদিও ২০২৬ সালের জুনে কূটনৈতিক অগ্রগতির ফলে উত্তাপ কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবুও এই বর্ধিত পরিচালন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতির ৭৫%-এরও বেশি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অবকাঠামো খাত জ্বালানি মূল্যের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্লাস্টিক পাইপের দাম ৩৬% পর্যন্ত বেড়েছে এবং সিমেন্ট, কংক্রিট, বালু, তামা ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রয়েছে।
সম্পদের পুনঃনির্মাণ খরচ এবং সময় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দুই থেকে তিন বছর আগে নির্ধারিত ‘ব্যবসায়িক স্থবিরতা’ (Business Interruption) ক্ষতিপূরণের মেয়াদী সীমা (Indemnity Periods) বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের সময়ের জন্য একেবারেই অপ্রতুল।
যখন কোনো বাণিজ্যিক সম্পত্তি তার প্রকৃত পুনর্নির্মাণ মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে বীমা করা হয় (Underinsurance), তখন দাবি নিষ্পত্তির সময় বীমা কোম্পানিগুলো কঠোরভাবে ‘এভারেজ ক্লজ’ (Average Clause) প্রয়োগ করে। এর ফলে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ—উভয় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো আনুপাতিক হারে বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
আইনি ও গাণিতিক প্রভাবের একটি স্পষ্ট চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| মূল্যায়নের বিষয় | গাণিতিক হিসাব ও বাস্তবিক প্রভাব |
| সম্পত্তির প্রকৃত পুনঃনির্মাণ/প্রতিস্থাপন মূল্য | $২০ মিলিয়ন (২ কোটি ডলার) |
| বিদ্যমান মোট বীমা কভারেজ (Sum Insured) | $১০ মিলিয়ন (১ কোটি ডলার) |
| আন্ডার-ইন্স্যুরেন্স বা স্বল্প-বীমার হার | ৫০% কম কভারেজ (অর্ধেক) |
| অগ্নিখণ্ড বা প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ | $৫ মিলিয়ন (৫০ লাখ ডলার) |
| এভারেজ ক্লজ প্রয়োগের পর প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণ | $২.৫ মিলিয়ন (২৫ লাখ ডলার) |
| ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নেট ক্ষতি/ঘাটতি | $২.৫ মিলিয়ন (নিজস্ব তহবিল থেকে বহনযোগ্য) |
জরুরি দিকনির্দেশনা: আন্ডার-ইন্স্যুরেন্সের কারণে হঠাৎ দেউলিয়া হওয়ার মতো মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয় এড়াতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ২ থেকে ৩ বছর পর পর স্বাধীন পেশাদার প্রপার্টি ভ্যালুয়ার বা মূল্য নির্ধারণকারীর (Professional Asset Valuation) মাধ্যমে তাদের সমস্ত স্থাবর ও মূলধনী সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান দীর্ঘায়িত মেরামত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসায়িক স্থবিরতার ক্ষতিপূরণ মেয়াদকাল (Indemnity Periods) প্রতি বছর পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য