জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

ঢাকার অনন্য আলোকবর্তিকা নবাবজাদি পরিবানু: শ্রদ্ধাঞ্জলি ও জীবনস্মরণ

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারের এক প্রগতিশীল, বিদুষী, সমাজহিতৈষী ও দূরদর্শী নারী নবাবজাদি পরিবানু। ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে এই মহিয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত নবাব খাজা আহসান উল্লাহ এবং কামরুন্নেসা বেগমের সুযোগ্য কন্যা। উনবিংশ শতাব্দীর রক্ষণশীল সামাজিক প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েও তিনি নিজের মেধা, সাহসিকতা ও মানবকল্যাণমুখী কাজের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

শিক্ষা, সাহসিকতা ও জমিদারি শিক্ষা

সে সময়ে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত ও অবরুদ্ধ। তবে পারিবারিক সচেতনতার কারণে পরিবানু গৃহশিক্ষক ও গৃহপরিচারিকার নিবিড় তত্ত্বাবধানে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। কেবল জ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি ছিলেন অসাধারণ সাহসী ও দৃঢ়চেতা এক ব্যক্তিত্ব। সমকালীন নারীদের বিপরীতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষভাবে ঘোড়সওয়ারি শিখেন। তাঁর এই অসাধারণ বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বের গুণে মুগ্ধ হয়ে পিতা নবাব খাজা আহসান উল্লাহ তাঁকে জমিদারি পরিচালনার নানা খুঁটিনাটি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেন। একপর্যায়ে নবাব আহসান উল্লাহ তাঁকে নিজের উত্তরাধিকারী করার পরিকল্পনাও করেছিলেন, কিন্তু নবাবের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সেই দূরদর্শী পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

বৈবাহিক জীবন ও ‘পরিবাগ’-এর নামকরণ

১৯০০ সালে নবাব পরিবারেরই অন্যতম সদস্য খাজা ভোলা মিয়ার পুত্র খাজা বদরুদ্দিনের সঙ্গে নবাবজাদি পরিবানুর রাজকীয় বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর তিনি ঢাকার দিলকুশা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে তিনি নবাব হাবিবুল্লাহর কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমিসহ ঢাকার শাহবাগ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরিবানুর বিশেষ উদ্যোগে প্রতি শনিবার এই সুবিশাল বাগানটি ঢাকার সম্ভ্রান্ত নারীদের অবকাশ যাপন, বিনোদন ও ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হতো। পর্দা প্রথার সেই যুগে নারীসমাজের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য এমন একটি নিরাপদ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত ব্যবস্থার সূচনা করা ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী, সাহসী ও প্রগতিশীল এক উদ্যোগ। তাঁর এই স্মৃতিবিজড়িত বাগানকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে ঢাকার সেই বিশাল এলাকাটি ‘পরিবাগ’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যা আজও তাঁর নামের গৌরবময় স্মৃতি বহন করে চলেছে।

নারীশিক্ষা ও সমাজকল্যাণে চিরস্মরণীয় অবদান

বাংলার নারীশিক্ষার বিস্তারে নবাবজাদি পরিবানুর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯২৪ সালে ঢাকায় নারীশিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ ‘কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল’ প্রতিষ্ঠা ও এর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য তিনি তাঁর বোনদের সঙ্গে মিলে তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা অনুদান দেন। সে সময়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সাহায্য ছিল অত্যন্ত বিরল এবং নারীশিক্ষা বিস্তারে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার

১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর এই প্রগতিশীল, মানবদরদী ও শিক্ষানুরাগী নারী ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকার বেগমবাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বাংলার নারীজাগরণ, সমাজকল্যাণ ও নারীশিক্ষার বিকাশের ইতিহাসে নবাবজাদি পরিবানুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, উদারতা এবং সমাজ সংস্কারের দূরদর্শী উদ্যোগ আজও আমাদের সমাজকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

ইয়ামান আহমেদ জিম | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

সর্বশেষ খবর