জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

ডেঙ্গুতে চার মৃত্যু, এক দিনে শনাক্তে নতুন রেকর্ড

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৬৩ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা। আগস্টের শেষ দিনেই সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, নতুন চারজনের মৃত্যু নিয়ে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে। একই সময়ে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন। অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাস শেষ হওয়ার আগেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক দিনের হিসাবেও রোগটির বিস্তারের গতি স্পষ্ট। রোববার (৩০ আগস্ট) আগের ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যুর পাশাপাশি ১ হাজার ৯৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। এক দিনের ব্যবধানে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে ৬৬ জন। একই সঙ্গে মৃত্যুও বেড়েছে একজন।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও রোগীর চাপ তৈরি হচ্ছে। সাধারণত ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, দুর্বলতা এবং বমি বা বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক রোগী কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে।

বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা শরীরে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। জ্বরের কারণ নিশ্চিত না হয়ে নিজের মতো করে ওষুধ গ্রহণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এডিস মশার বংশবিস্তার। এই মশা ঘরের ভেতর ও আশপাশের জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, বালতি, ড্রাম, ছাদের বিভিন্ন অংশ কিংবা বৃষ্টির পানি জমে থাকা ছোট পাত্রও সম্ভাব্য প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই শুধু মশা নিধন কার্যক্রম চালালেই হবে না; নিয়মিতভাবে পানি জমার উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা পরিষ্কার করাও প্রয়োজন।

বাড়ির বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন ও অন্যান্য স্থাপনার আশপাশেও নজর দেওয়া জরুরি। একটি ছোট পাত্রে জমে থাকা পানিও এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ কারণে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও জমে থাকা পানি অপসারণকে প্রতিরোধব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলায় এডিস মশা সক্রিয় থাকতে পারে বলে শুধু রাতে মশারির ব্যবহার যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহার, শরীরের অনাবৃত অংশ কম রাখা এবং ঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে মশার কামড়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সর্বশেষ দুই দিনের হিসাব পরিস্থিতির পরিবর্তনও তুলে ধরছে। ৩০ আগস্টে যেখানে এক দিনে ১ হাজার ৯৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল, পরদিন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৬৩। একই সময়ে এক দিনে মৃত্যুর সংখ্যাও তিন থেকে বেড়ে চার হয়েছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ কতটা বাড়বে, তা আবহাওয়া, মশার প্রজননের পরিবেশ এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার এই সময়ে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রধান চিত্র হলো— নতুন করে ১ হাজার ১৬৩ জন আক্রান্ত, চারজনের মৃত্যু এবং বছরের মোট আক্রান্ত ৩৫ হাজার ৮৪৬ জনে পৌঁছানো। মোট মৃত্যুও এখন ৯৭।

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা গেলে এডিস মশার বিস্তার কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবা ও মশা নিয়ন্ত্রণ—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর