খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈরিতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে ইরানকে। নানা কাঠখড় পুড়িয়ে, একের পর এক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে অবশেষে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ করল তারা। মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পড়া ভিসা জটিলতা এবং নিজ দেশের বাইরে অন্য দেশে বেসক্যাম্প করতে বাধ্য হওয়া—এতসব প্রতিবন্ধকতার মাঝেও বিশ্বমঞ্চে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে এশিয়ার এই পরাশক্তি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আফ্রিকার দেশ মিসরের বিপক্ষে সরাসরি নকআউট বা শেষ ৩২-এ ওঠার সুবর্ণ সুযোগও তৈরি করেছিল তারা। কিন্তু ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে যোগ করা সময়ে করা তাদের নিশ্চিত জয়সূচক গোলটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় সব ওলটপালট হয়ে যায়।
মিসরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার কারণে ইরানের নকআউটের টিকিট পাওয়ার ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে। গ্রুপ পর্বের অন্য দলগুলোর সব খেলা শেষ হওয়ার পরই কেবল নিশ্চিত হবে যে তারা টুর্নামেন্টে টিকে থাকবে নাকি বিদায় নেবে। অথচ ম্যাচের স্টপেজ টাইমে সামান্য অফসাইডের কারণে গোলটি রেফারি বাতিল না করলে কিংবা ম্যাচের শুরুর দিকে সায়েদ ইজাতোলাহির দুর্দান্ত হেডটি সাইড বারের বদলে ক্রসবারে লেগে ফিরে না এলে গল্পের রূপরেখা অন্যরকম হতে পারত।
ম্যাচের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। ঠিক ৯৩তম মিনিটে ডিফেন্ডার শোজা খালিলজাদেহ সম্ভবত ইরানি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ও বিখ্যাত গোলটি করেছিলেন। বল জাল ছোঁয়ার সাথে সাথে মাঠ ও গ্যালারিতে ইরানের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মাঝে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই উল্লাস স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক মুহূর্ত। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গোল করার মুহূর্তে তাঁর পা প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্ডারকে সামান্য অতিক্রম করেছিল। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের সেই ব্যবধানের জন্য গোলটি অফসাইড বলে বাতিল ঘোষণা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে ইরানের উৎসবের আমেজ রূপ নেয় গভীর বিষাদে। ম্যাচের স্কোরলাইন ২-১ থেকে আবার ১-১ এ ফিরে আসায় এই ড্রয়ের সুবাদে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে নিজেদের জায়গা পাকা করে ফেলে মিসর।
এই চরম ধাক্কার পর ইরানকে এখন নকআউটের টিকিট পেতে অন্য দলগুলোর সমীকরণের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হবে। নিজেদের ভাগ্য এখন আর তাদের নিজেদের হাতে নেই। শেষ ৩২-এ যেতে হলে এখন আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া ম্যাচটি ড্র হতে হবে, অথবা ডিআর কঙ্গোর কাছে উজবেকিস্তানকে হারতে হবে, কিংবা ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে অন্তত এক পয়েন্ট পেতে হবে। এই তিনটি সমীকরণের যেকোনো একটি মিললেই কেবল ইরান পরের রাউন্ডে যেতে পারবে।
টুর্নামেন্টজুড়ে শুরু থেকেই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার কারণে ইরানের ফুটবল ফেডারেশন আগেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হাতের মুঠোয় আসা জয় এভাবে ফসকে যাওয়ায় নিজের ভাগ্যকেই সবচেয়ে বেশি দুষলেন দলটির প্রধান কোচ আমির গালেনোয়েই। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “ফুটবলে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে এবং বর্তমান যুগে সবকিছুই আধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে চলে, আমি সেটা মনে-প্রাণে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আজ আমাদের যে ভাগ্যবিপর্যয় হলো, তা নিয়ে আমি সত্যিই খুব মনঃক্ষুণ্ণ। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে আমাদের গোলটি বাতিল হয়ে গেল। প্রযুক্তির বিচারে সিদ্ধান্তটি হয়তো ন্যায্য ছিল, কিন্তু এই দুর্ভাগ্য আমাকে ভেতর থেকে পুড়োচ্ছে।”
ইরান কোচ অত্যন্ত আফসোস নিয়ে আরও বলেন, “আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা জটিলতার কারণে আমার দলের কোচিং স্টাফের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যথাসময়ে দলের সাথে যোগ দিতে পারেননি। এসব কারণে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে আমি ভাবতাম যে আমরা কেবল একটি অবহেলিত বা সুবিধাবঞ্চিত দল। কিন্তু আজ মাঠের এই চরম দুর্ভাগ্য দেখার পর আমি বুঝতে পারছি, আমরা কেবল অবহেলিতই নই, আমরা আসলে একটি চরম দুর্ভাগ্যপীড়িত দলও বটে।” বিশ্বমঞ্চে ইরানের এমন লড়াকু পথচলা ও দুর্ভাগ্যজনক ড্র এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবেগের সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য