,

পর্তুগালে বাংলাদেশিদের কাজের বড় সুযোগ, তবে মানতে হবে সঠিক নিয়ম

ইউরোপের অন্যতম শান্ত ও সুন্দর দেশ পর্তুগাল এখন বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন খাতে তীব্র শ্রমিক সংকট তৈরি হওয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে নির্মাণশিল্প, কৃষি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন এবং বিভিন্ন কলকারখানায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা আকাশচুম্বী। শুধু শ্রমসাধ্য কাজই নয়, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাতেও বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছেন। সরকারের অভিবাসন-বান্ধব নীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে পর্তুগাল এখন কর্মসংস্থানের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইউরোপের এই দেশটিতে সফল হতে হলে কেবল যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই হবে না; প্রয়োজন নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, পর্তুগিজ বা ইংরেজি ভাষার বুনিয়াদি জ্ঞান এবং সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে আবেদন প্রক্রিয়াকরণ।

উচ্চশিক্ষার পর কাজের সুযোগ ও সনদের সমতা নির্ধারণ

পর্তুগালে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে বিশ্বের নামকরা সব কোম্পানিতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। মূলত দুটি পদ্ধতিতে তারা পেশাদার কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিটি হলো ‘ইকুইভ্যালেন্স’ বা সনদের সমতা নির্ধারণ। দেশটির বিশেষ আইন (Decreto-Lei nr. 238/83) অনুযায়ী, একজন বিদেশি নাগরিক তার ডক্টরেট, মাস্টার্স বা ব্যাচেলর ডিগ্রিকে পর্তুগিজ শিক্ষাব্যবস্থার সমমান করার জন্য আবেদন করতে পারেন। ইউনিভার্সিটি অব লিসবনের মাধ্যমে অনলাইনেই এই সেবাটি পাওয়া যায়। তবে আবেদনের জন্য শিক্ষার্থীর অবশ্যই বৈধ রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি থাকতে হবে। কারণ, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইন্টারভিউতে ডাকার আগে কাজের আইনি অনুমতি আছে কি না, তা অত্যন্ত কড়াকড়ির সঙ্গে যাচাই করে।

বাংলাদেশি শিক্ষাগত সনদকে সমমান করার প্রক্রিয়াটি বেশ সুনির্দিষ্ট। প্রথমেই মূল সার্টিফিকেট ও নম্বরপত্র একজন নিবন্ধিত আইনজীবীর মাধ্যমে পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ ও নোটারি করাতে হয়। এরপর লিসবনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আসল সনদ যাচাই করিয়ে পর্তুগালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তা সত্যায়িত করতে হবে। এই অনলাইন প্রক্রিয়ায় আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করা রয়েছে। ডক্টরেট ডিগ্রির সমমানের জন্য ৬০০ ইউরো, মাস্টার্সের জন্য ৫৫০ ইউরো এবং ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য ৫০০ ইউরো অফেরতযোগ্য ফি হিসেবে জমা দিতে হয়।

ভিসা প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র

পর্তুগালে সরাসরি কাজের ভিসা পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সে দেশের কোনো বৈধ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরির নিয়োগপত্র বা ‘অফার লেটার’ পাওয়া। কর্মী বাছাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানই পর্তুগালের শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিটের প্রাথমিক আবেদনটি করে থাকে।

ওয়ার্ক পারমিট চলে আসার পর কাজের ভিসার জন্য আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র জমা দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে:

  • অন্তত ছয় মাসের মেয়াদসহ বৈধ পাসপোর্ট।

  • পর্তুগিজ কোম্পানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চাকরির চুক্তিপত্র।

  • শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কাজের অভিজ্ঞতার সত্যায়িত সনদ।

  • নিজ দেশ থেকে সংগৃহীত এবং সত্যায়িত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।

  • একটি আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার জীবনবৃত্তান্ত (CV)।

  • কিছু ক্ষেত্রে থাকার জায়গার নিশ্চয়তা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন।

বেতন কাঠামো এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি

পর্তুগালের শ্রমবাজারের বেতন কাঠামো মূলত কাজের ধরন ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ বা অদক্ষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মাসিক গড় আয় সাধারণত ৯২০ থেকে ১০০০ ইউরোর কাছাকাছি হয়ে থাকে। তবে যারা আইটি, ফিন্যান্স বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কারিগরি খাতে দক্ষ, তাদের আয় অনেক বেশি। অভিজ্ঞতা ও পদের ওপর ভিত্তি করে দক্ষ কর্মীরা প্রতি মাসে ১২০০ থেকে শুরু করে ৩০০০ ইউরো বা তারও বেশি উপার্জন করতে পারেন।

পর্তুগালে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা আফজাল উদ্দিন নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে জানান, তিনি ইউনিভার্সিটি অব নোভায় মাস্টার্স করতে এসে শুরুতে বেশ সংকটে পড়েছিলেন। তবে হাল ছাড়েননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সহযোগিতায় নিজের লিংকডইন প্রোফাইল পেশাদারভাবে সাজিয়ে একের পর এক ইন্টারভিউ দিতে থাকেন। বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বর্তমানে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক (অ্যাকাউন্ট্যান্ট) হিসেবে ভালো বেতনে কাজ করছেন।

নীতি পরিবর্তন ও প্রতারণা এড়ানোর উপায়

সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগাল সরকারের ভিসা নীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে দেশটিতে গিয়ে চাকরি খোঁজার জন্য যে ‘জব সিকার ভিসা’ দেওয়া হতো, তার পরিধি এখন বেশ সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে আসার আগে থেকেই চাকরি নিশ্চিত করার প্রবণতা অনেক বেড়েছে।

এই সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু চক্র বা ভুয়া দালালরা ইউরোপে চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে চাকরিপ্রত্যাশীদের সরাসরি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য জব পোর্টাল বা সরাসরি পর্তুগিজ কোম্পানির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। সঠিক নিয়ম মেনে এবং নিজের দক্ষতা প্রমাণ করে আবেদন করলে পর্তুগাল হতে পারে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য এক নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।