আমানতকারীদের আশ্বস্ত করলেন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহির হোসেন আমানতকারীদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা বজায় রেখে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা পেছনে ফেলে গ্রাহকদের কোনো দ্বিধা ছাড়াই লেনদেন অব্যাহত রাখা উচিত।

তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের একটি পর্ষদ গঠন করা হচ্ছে, যাতে দক্ষ, যোগ্য এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত থাকেন। বর্তমানে তিনি একক সদস্যের অন্তর্বর্তী বোর্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে পরিবর্তনকালীন সময়ে ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।

গত রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাংকটিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, গ্রাহকদের বিক্ষোভ এবং বিপুল পরিমাণ আমানত উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যাংকটি তারল্য সংকটের মুখে পড়ে।

এদিকে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে ‘প্রাথমিক বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগঠনটি ১ জুন থেকে খুরশীদ আলমের নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল। সংগঠনের প্রতিনিধি নুর নবী মানিক সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুককে পুনর্বহাল করা এবং পূর্ববর্তী মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা শেয়ার ফেরত দেওয়া।

তবে মোহাম্মদ জহির হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, ওমর ফারুক ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে তাঁকে পুনর্বহালের সুযোগ নেই।

ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

বিষয়তথ্য
পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্তরোববার রাত
নতুন চেয়ারম্যানমোহাম্মদ জহির হোসেন
প্রস্তাবিত নতুন বোর্ড৫ সদস্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা২,৫০০ কোটি টাকা
সচেতন গ্রাহক ফোরামের আন্দোলন শুরু১ জুন
বিশেষ সুবিধার আওতায় পুনরায় চালু করা যাবে১–১৫ জুনের মধ্যে বন্ধ হওয়া হিসাব

ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের ভিড় অব্যাহত থাকলেও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, আগের কয়েক দিনের তুলনায় আমানত উত্তোলনের চাপ কিছুটা কমেছে। গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক অতিরিক্ত ২,৫০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। তবে পুরো অর্থ ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, আতঙ্কের কারণে যারা আমানত তুলে নিয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার ব্যাংকে ফিরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একটি বড় শাখায় হিসাব বন্ধের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে এসেছে, যা গ্রাহক আস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া আমানত হিসাব পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছে। গত ১ জুন থেকে ১৫ জুনের মধ্যে বন্ধ হওয়া মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর), এমএসবি, এমএমপিডিএস এবং এমএসএস হিসাবধারীরা আবেদন সাপেক্ষে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের হিসাব পুনরায় চালু করতে পারবেন। পুনরায় সক্রিয় হওয়া হিসাবগুলো নিয়মিত হিসাবের সব সুবিধা পাবে।

এ বিষয়ে জারি করা অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় ব্যাংকটি সব বিভাগ, জোন ও শাখাকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সঙ্গে মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে পুনরায় লেনদেন শুরু করতে উৎসাহিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

অন্যদিকে, ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন এক বিবৃতিতে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপটি সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ। তাঁর মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতে অনুভূত হচ্ছিল।

এবিবি আশা প্রকাশ করেছে, নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকটিতে সুশাসন, জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। একই সঙ্গে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনের আস্থা পুনর্গঠনে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে সংগঠনটি মনে করে।