বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, বর্তমান প্রশাসনের একজন নির্দিষ্ট মন্ত্রী একাই দেশের সব মন্ত্রণালয়ের কাজ পরিচালনা করছেন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হয়েও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কথা ওই মন্ত্রীকেই বলতে হচ্ছে। শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধানশীর্ষক অতিথির বক্তব্যে তিনি এই রাজনৈতিক মন্তব্য করেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দেশের সাধারণ জনগণের চলমান জনদুর্ভোগ নিরসন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে এই বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
চট্টগ্রামের সমাবেশের প্রেক্ষাপট ও জামায়াত আমিরের বক্তব্য
চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের ইঙ্গিত করে এবং তাদের প্রতি আলোকপাত করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, “চট্টগ্রামের মানুষ অত্যন্ত ভাগ্যবান। বর্তমান সরকারের আমলে সর্ব বিষয়ে বিশারদ ও পারদর্শী এমন একজন মন্ত্রীও আপনারা এই অঞ্চল থেকে পেয়েছেন। সত্যিই আপনারা অনেক ভাগ্যবান। বাংলাদেশের আর একটি জেলাও এমন নেই, যেখানে এক মন্ত্রী সকল মন্ত্রণালয় একাই চালান। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথাও শেষ পর্যন্ত তাঁকেই বলতে হয়।” তিনি বর্তমান প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও বলেন, “আমার অত্যন্ত কষ্ট লাগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য। তাঁর আশপাশে উনি কাদের বসিয়েছেন, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।”
ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ জনগণ আশা করেছিল যে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর সমাজ ও বাজার ব্যবস্থা থেকে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো এবং দেশে চাঁদাবাজির পরিমাণ পূর্বের তুলনায় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জামায়াত আমির আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে দেশের দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে দমন করতে চেয়েছিল এবং দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন সাধারণ জনগণকে দেখতে হচ্ছে যে দুর্নীতি দমন হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো দুর্নীতিকে একপ্রকার জাতীয়করণ করা হয়েছে।
১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশের বিবরণ ও অন্যান্য নেতৃত্ব
ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির চট্টগ্রাম অঞ্চল টিমের পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান। ১১ দলীয় জোটের এই শীর্ষ সমাবেশে প্রধান বক্তা ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। সমাবেশে উপস্থিত জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলার সার্বিক অবনতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন এবং সরকারের কাছে জনদুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান।
সমাবেশের সভাপতি মুহাম্মদ শাহজাহান তাঁর বক্তব্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। বিশেষশীর্ষক অতিথি হিসেবে উপস্থিত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম) দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে ১১ দলীয় জোট রাজপথে তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে এই সমাবেশটি সম্পন্ন হয়।
জনদুর্ভোগ নিরসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দাবি
১১ দলীয় জোটের এই বিভাগীয় সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকারের প্রতি জোর তাগিদ দেন। একই সাথে গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি জানানো হয়। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারকে জনমুখী নীতি গ্রহণ করার আহ্বান জানান। দেশের প্রান্তিক মানুষের কষ্ট লাঘব করতে এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্র ভেঙে দিতে অবিলম্বে সব ধরনের অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সমাবেশ শেষ করা হয়।
