খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই মে ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম

বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন আজাদ রহমান। তিনি ছিলেন একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকবি ও সঙ্গীত পরিচালক—যার সৃষ্টিশীলতা বাংলা গানের ভুবনকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে নিয়ে যায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাধনায়। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেয়াল সংগীতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের খেয়াল গানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন; অনেকেই তাঁকে বাংলাদেশের খেয়াল গানের জনক বলে অভিহিত করেন।
চলচ্চিত্রে তাঁর সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে নির্মিত টলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র মিস প্রিয়ংবদা-এ সুবীর সেন-এর সঙ্গে যৌথভাবে সঙ্গীত পরিচালনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম সুরারোপ করা ছবি ছিল আগন্তুক, যার নির্মাতা ছিলেন বাবুল চৌধুরী।
সত্তরের দশকে তাঁর সুর ও কণ্ঠে অসংখ্য গান মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায় এপার ওপার চলচ্চিত্রের “ভালবাসার মূল্য কত”, ডুমুরের ফুল-এর “করো মনে ভক্তি মায়ের” এবং দস্যু বনহুর-এর “ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়” গানগুলো।
চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে দেশাত্মবোধক গানেও তিনি রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান। তাঁর সুর করা “জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো” গানটি আজও বাঙালির আবেগ, দেশপ্রেম ও চেতনার এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী বিভাগে।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সেলিনা আজাদ। তাঁদের তিন কন্যা—রুমানা আজাদ, রোজানা আজাদ ও নাফিসা আজাদ—ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন সঙ্গীতময় পরিবেশে। তাঁরা একত্রে গড়ে তুলেছেন ‘আজাদ সিস্টার্স’, এবং নিয়মিত গান প্রকাশ করছেন তাদের ইউটিউব চ্যানেলে।
সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সমান মনোযোগী। তাঁর রচিত সঙ্গীতবিষয়ক গ্রন্থ বাংলা খেয়াল দুই খণ্ডে প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।
স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও তিনি কাজ করেছেন ভিন্নধর্মী উদ্যোগে। ১৯৭৬ সালে কবরী ও সোহেল রানা-কে নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন প্রাপ্তবয়স্কদের সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র গোপন কথা।
২০২০ সালের ১৬ মে এই কিংবদন্তি শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর সুর, গান ও সৃষ্টি আজও বেঁচে আছে বাঙালির হৃদয়ে। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে আজাদ রহমান চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য