রংপুরে শ্যালকের স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: অভিযুক্ত দুলাভাই সজল গ্রেপ্তার

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় শ্যালকের স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় সজল মিয়া (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (১০ মে, ২০২৬) দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত সজল মিয়া কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর শহরের পাঠানটারী এলাকার মৃত মাহফুজার রহমানের পুত্র বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এর আগে শনিবার (৯ মে) দিবাগত গভীর রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও এজাহারের বিবরণ

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকায় একটি কারখানায় কর্মরত রয়েছেন। ওই নারী তার তিন সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে স্বামীর বাড়িতে বসবাস করেন। ঘটনার দিন গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার শাশুড়ি একই এলাকায় অবস্থিত তার মেয়ের (গৃহবধূর ননদ) বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকার সুযোগে অভিযুক্ত সজল মিয়া সেখানে উপস্থিত হন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাড়িতে অন্য কেউ না থাকার সুযোগ নিয়ে সজল মিয়া পেছন দিক থেকে ওই গৃহবধূকে জাপটে ধরেন এবং জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালান। এ সময় ওই নারীর আর্তচিৎকার শুনে তার ১০ বছর বয়সী কন্যা এগিয়ে আসে। সন্তানের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে অভিযুক্ত সজল মিয়া দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারটি সামাজিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

পূর্ববর্তী অপরাধের ইতিহাস ও মীমাংসার চেষ্টা

ভুক্তভোগী নারীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত সজল মিয়া আগেও এমন অপরাধে লিপ্ত হয়েছিলেন। প্রায় এক বছর পূর্বেও তিনি ওই গৃহবধূর সঙ্গে অনভিপ্রেত ও অশোভন আচরণ করেন। সে সময় বিষয়টি গৃহবধূর স্বামীর পরিবারকে জানানো হলে পারিবারিকভাবে একটি সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই বৈঠকে অভিযুক্ত সজল ভবিষ্যতে আর কখনো এমন গর্হিত কাজ করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন। পরিবারের মান-সম্মান এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে সে সময় বিষয়টি আইনগত পর্যায় পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তবে ভুক্তভোগী নারী আক্ষেপ করে জানান যে, পূর্বের ঘটনায় কঠোর শাস্তি না হওয়ায় অভিযুক্ত সজল পুনরায় একই ধরনের দুঃসাহস দেখিয়েছেন। বর্তমানে তিনি এবং তার সন্তানরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং এই আতঙ্কে তারা বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয় সচেতন মহল ও অধিকার কর্মীদের উদ্বেগ

পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের আড়ালে সংঘটিত এই নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল এবং নারী অধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নারী অধিকার কর্মীদের মতে, লোকলজ্জা এবং পারিবারিক চাপের কারণে অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও তা মুখ ফুটে বলতে পারেন না। বিশেষ করে নিকটাত্মীয়দের দ্বারা যখন এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন তা সামাজিক গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। এর ফলে অপরাধীরা বারবার একই ধরনের অপরাধ করার সুযোগ পায় এবং তাদের মধ্যে কোনো আইনি ভীতি থাকে না। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, পরিবারের ভেতরে সংঘটিত এ ধরনের সহিংসতাকে গোপন না রেখে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পারিবারিক বিশ্বাসের আস্থাকে পুঁজি করে নারীদের প্রতি সহিংসতার এই ঊর্ধ্বমুখী হার সামাজিকভাবে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা প্রদান করছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।

পুলিশের অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের হারাগাছ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জাহিদ এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভুক্তভোগী নারী নিজে বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়। মামলা হওয়ার পর থেকেই পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে ওঠে।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, শনিবার গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সজল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার দুপুরেই তাকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।