গাজীপুরে মুদি দোকানি কুলসুম হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন ও তিন ঘাতক গ্রেপ্তার

গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল থানাধীন মেঘডুবী এলাকায় চাঞ্চল্যকর মুদি দোকানি কুলসুম আক্তার (৪৬) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তির সহায়তায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে রংপুর থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর ঘরে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তদন্ত প্রক্রিয়া

গত ২৬ এপ্রিল গাজীপুরের মেঘডুবী এলাকায় নিজ বাসভবনে খুন হন কুলসুম আক্তার। তিনি পেশায় একজন ক্ষুদ্র মুদি দোকানি ছিলেন। জনবহুল এলাকায় দিনের বেলা এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট স্বপ্রণোদিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। এক মাস অতিবাহিত হওয়ার আগেই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সংস্থাটি।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের পরিচয়

পিবিআইয়ের অভিযানে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানা এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন:

নামবয়সপিতার নামস্থায়ী ঠিকানাপেশাগত পরিচয়
কামরুজ্জামান৩৫রফিকুল ইসলামগঙ্গাচড়া, রংপুরএ ওয়ান পলিমার কারখানার শ্রমিক
আমজাদ হোসেন৩০বাদশা মিয়াগঙ্গাচড়া, রংপুরএ ওয়ান পলিমার কারখানার শ্রমিক
আফজাল হোসেন৩৩মো. আফজালগঙ্গাচড়া, রংপুরএ ওয়ান পলিমার কারখানার শ্রমিক

আসামিরা সবাই মেঘডুবী কড়ইটেক এলাকার ‘এ ওয়ান পলিমার’ কারখানায় কর্মরত ছিলেন এবং তারা নিহতের বাসার নিকটবর্তী কাজল মিয়ার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।

হত্যাকাণ্ডের কারণ ও পরিকল্পনা

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুলসুম আক্তারের দোকান থেকে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় করতেন। বকেয়া টাকা পরিশোধ নিয়ে কিছুদিন আগে কুলসুমের সঙ্গে তাদের তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। মূলত এই পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ এবং কুলসুমের একাকী থাকার সুযোগ নিয়ে তারা ডাকাতির পরিকল্পনা করে।

হত্যাকাণ্ডের আগের দিন অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল রাতে অভিযুক্তরা কৌশলে কুলসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায় যে, তারা তাদের বান্ধবীকে নিয়ে কিছু সময় কাটানোর জন্য তার ঘরটি ব্যবহার করতে চায়। কুলসুম তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে পরদিন ২৬ এপ্রিল দুপুরে তাদের আসতে বলেন।

নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল দুপুরে কামরুজ্জামান বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে কুলসুমের বাসায় প্রবেশ করে। এরপর অত্যন্ত সুকৌশলে এনার্জি ড্রিংকের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে কুলসুমকে পান করানো হয়। পানীয়টি গ্রহণের কিছুক্ষণ পর তিনি অচেতন হয়ে পড়লে ঘাতকরা ঘরে থাকা ধারালো দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।

হত্যাকাণ্ড শেষে তারা কুলসুমের ঘর তল্লাশি করে নগদ ৩ হাজার ২৫০ টাকা এবং কিছু অলংকার (শিশুদের হাতের চুড়ি, টিকলি ও গলার চেইন) লুট করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে রংপুরে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে লুটকৃত অলংকারগুলো বিক্রির চেষ্টা করলে তারা জানতে পারে যে, সেগুলো স্বর্ণের নয় বরং ইমিটেশন বা সিটি গোল্ডের তৈরি ছিল।

আইনি পদক্ষেপ ও উদ্ধারকৃত আলামত

পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রকিবুল আক্তার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান যে, গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো দা এবং একটি বাঁশের লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিদের বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।