মেহেরপুরে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ প্রয়োগে নারীর সর্বস্ব লুট

মেহেরপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র হোটেল বাজার মোড় এলাকায় ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (স্কোপোলামিন) নামক বিশেষ এক ধরণের রাসায়নিক প্রয়োগ করে এক নারীর নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নিয়েছে একটি সঙ্ঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। রবিবার (১০ মে) দুপুরে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। জনাকীর্ণ এলাকায় দিনের আলোতে এমন দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘটনার বিবরণ

ভুক্তভোগী আনোয়ারা খাতুন মেহেরপুর শহরের স্টেডিয়াম পাড়ার বাসিন্দা এবং ইয়ালিদ হোসেনের স্ত্রী। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারা খাতুন তার বাসা থেকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে শহরের বাণিজ্যিক এলাকা হোটেল বাজার মোড়ের দিকে রওনা হন। তিনি যখন হোটেল বাজার মোড়ে পৌঁছান, তখন অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি তার গতিরোধ করে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে কথা বলা শুরু করে।

আলাপচারিতার একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি অত্যন্ত সুকৌশলে আনোয়ারা খাতুনের নাকের সামনে তীব্র গন্ধযুক্ত কোনো বস্তু বা রাসায়নিক ধরেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, ওই বস্তুর ঘ্রাণ নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন অনুভূত হতে থাকে। তিনি প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা এবং এক ধরণের ঘোরগ্রস্ত বা অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন। ভুক্তভোগীর এই অসংলগ্ন অবস্থার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা তার নিকট থাকা নগদ ৫০০ টাকা এবং কানে পরিহিত এক জোড়া স্বর্ণের দুল খুলে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

পরবর্তীতে স্থানীয় পথচারীরা তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পেয়ে প্রাথমিক সেবা প্রদান করলে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হন এবং বুঝতে পারেন যে তিনি বড় ধরণের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও প্রতারণার ধরন

অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এই কৌশলে ব্যবহৃত রাসায়নিককে ‘স্কোপোলামিন’ বলা হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত। নিচে এই ধরণের অপরাধের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
ব্যবহৃত রাসায়নিকস্কোপোলামিন (Scopolamine) বা শয়তানের নিঃশ্বাস।
প্রয়োগ পদ্ধতিরুমাল, টিস্যু, ভিজিটিং কার্ড বা কথার ছলে নাকে ঘ্রাণ দেওয়া।
শারীরিক প্রতিক্রিয়াস্মৃতিভ্রম, চিন্তা করার ক্ষমতা হারানো এবং অন্যের নির্দেশ পালন করা।
মূল লক্ষ্যসাধারণত একা চলাচলকারী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তি।
অপরাধের উদ্দেশ্যঅর্থ, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান ইলেকট্রনিক ডিভাইস ছিনতাই।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ

শহরের ব্যস্ততম মোড়ে এ ধরণের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেহেরপুর শহরে সাম্প্রতিক সময়ে ‘অজ্ঞান পার্টি’ ও ‘মলম পার্টি’র তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাজার ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নারীদের টার্গেট করে এই চক্রগুলো সক্রিয় রয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত করার জন্য ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে ডিবি পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ সতর্কতা

তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন জনসাধারণকে নিম্নোক্ত সুরক্ষা মূলক পরামর্শ প্রদান করেছেন:

  • রাস্তায় অপরিচিত ব্যক্তির সাথে কথোপকথন এড়িয়ে চলা।

  • অপরিচিত কেউ কোনো কিছু শুঁকতে দিলে বা কোনো কাগজ/কার্ড হাতে দিলে তা গ্রহণ না করা।

  • জনাকীর্ণ স্থানে একা চলাচলের সময় স্বর্ণালংকার প্রদর্শনীতে সতর্ক থাকা।

  • সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর উপস্থিতি টের পেলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করা।

ভুক্তভোগী পরিবার বর্তমানে এই ঘটনায় থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।