চেচেন বাহিনী কি আসলে ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে, রাশিয়ার ইউক্রেনে অভিযানের তখন দিন হয়েছে দুই। রাশিয়ার চেচনিয়া প্রজাতন্ত্র এর প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ ঘোষণা করে বলেন , যুদ্ধে রুশ সেনাদের হয়ে লড়ছেন চেনেন তার যোদ্ধারা। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনে চেনেন যোদ্ধারা লড়াইয়ের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পর্যবেক্ষকেরা ভিন্ন কথা বলছেন ।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, চেচেন বাহিনী চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে না। বরং রমজান কাদিরভের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ক্রেমলিনের পক্ষে প্রচার–প্রচারণার উদ্দেশ্যে জনসংযোগ চালানো হচ্ছে এই বাহিনীর মাধ্যমে। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, চেচেন বাহিনীর রাশিয়ার জন্য লড়াই এই প্রথম না। ২০০৮ সালে জর্জিয়ায়, ২০১৪–১৫ সালে ইউক্রেনে ও সিরিয়া যুদ্ধে তাদের পাশে পেয়েছে মস্কো।

চেচেন বাহিনী কি আসলে ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে
‘জনসংযোগের কাজ চলছে’
ইউক্রেনে চেচেন বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে আল–জাজিরাকে ককেশাসভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘কাভকাজকি উজেল’–এর প্রধান সম্পাদক গ্রিগরি শভেদভ বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে একটি জনসংযোগের কাজ চলছে। ইউক্রেনে চেচেন যোদ্ধারা এটা করছেন।’
তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর ককেশাসে সহিংসতা কমে এসেছে। এ ছাড়া মস্কোর কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে চেচনিয়া যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি পেয়ে থাকে, তা যৌক্তিকতা হারাতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে নিজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে ইউক্রেনে চেচেন যোদ্ধাদের পাঠানো রমজান কাদিরভের সামনে একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে।
এদিকে ইউক্রেনে হামলার কারণে নানা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে রাশিয়া। আর্থিক সংকটে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। এর ফলে রাশিয়ার আঞ্চলিক সরকারগুলোকে তহবিল সরবরাহের ক্ষমতা কমে যেতে পারে মস্কোর। এর আওতায় পড়তে পারে চেচনিয়াও।
এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়ে রমজানের আনুগত্য প্রদর্শনের কৌশল কাজে আসছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৬ মার্চ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আর্থিক সহায়তা নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে অন্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রমজানও। বৈঠকে তাঁকে ধন্যবাদ জানান পুতিন।
শভেদভ বলেন, রমজানের প্রতি পুতিনের এই মনোভাব থেকে এটাই বোঝা যায়, ইউক্রেনে জনসংযোগ চালানো শুধু চেচেনদের উদ্যোগ না, এমনটি করতে উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চেচেন বাহিনীর জনসংযোগের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার ও বাইরের দেশগুলোতে তথ্যযুদ্ধে জেতার চেষ্টাই চলছে না, পাশাপাশি খুব শিগগির রাজনৈতিক কিছু কৌশলও বেছে নেবে ক্রেমলিন। শভেদভের মতে, ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ায় দমনমূলক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ সমাজে চেচেনবাদ (চেচেনদের জন্য রাশিয়ার নেওয়া নীতি) শুধু বাড়বেই। এটা শুধু দমন–পীড়নই নয়, বৈধতার জন্য ক্ষমতার ব্যবহারও। আমরা এর মধ্যেই এটি দেখতে পাচ্ছি। তবে প্রশ্ন হলো, এটা কতদিন চলবে, সেটাই দেখার বিষয়।’
ইউক্রেনে চেচেন যোদ্ধারা
ইউক্রেন যুদ্ধে চেচেন যোদ্ধাদের অংশ নেওয়া ক্রেমলিনের প্রতি রমজানের আনুগত্যের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক ভিডিও বার্তায় রমজান বলেন, ইউক্রেনে অভিযান নিয়ে পুতিনের সিদ্ধান্ত সঠিক। যেকোনো পরিস্থিতিতে চেচনিয়া প্রজাতন্ত্র তাঁর নির্দেশ মেনে চলবে।
সম্প্রতি রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির খবরে বলা হয়, ইউক্রেনে যুদ্ধের ময়দানে নামানোর জন্য প্রায় ১২ হাজার যোদ্ধা প্রস্তুত রেখেছে চেচনিয়া। তবে ইউক্রেনে কতজন চেচেন যোদ্ধা আদতে রয়েছেন, তা জানা যায়নি। উত্তর ককেশাসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরল্ড চেম্বার্স বলছে, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাওয়া রুশ বহরে রয়েছেন চেচেন যোদ্ধারা। এমনকি দক্ষিণের বন্দরনগর মারিউপোলেও তাঁদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
তবে চেচেন বাহিনী ইউক্রেনে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না বলে দাবি করেছেন রুশপন্থী বিদ্রোহীদের কয়েকজন নেতা ও পর্যবেক্ষক। ১৫ মার্চ ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশপন্থী বিদ্রোহী বাহিনীর সাবেক কমান্ডার ইগর গিরকিন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দাবি করেন, চেচেন যোদ্ধারা মারিউপোলে যুদ্ধে অংশ নেননি। পরদিন এক সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেন রুশপন্থী বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার আলেকজান্ডার খোদাকোভিস্কি।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান কনফ্লিক্ট ইন্টেলিজেন্সের প্রতিষ্ঠাতা রুসলান লেভিয়েভ বলেন, চেচেন যোদ্ধারা যে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁরা সম্মুখ বাহিনীর পেছনে থাকেন। আর সুন্দর সুন্দর ভিডিও করেন।

কে এই রমজান কাদিরভ
রমজান কাদিরভ চেচনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আখমাদ কাদিরভের ছেলে। ২০০৪ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আখমাদ। এর তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট হন রমজান।
আখমাদ ও রমজান দুজনই প্রথম চেচেন যুদ্ধে (১৯৯৪–১৯৯৬ সাল) রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধে (১৯৯৯–২০০০ সাল) রাশিয়াকে সমর্থন জানান বাবা–ছেলে। যুদ্ধে জয় পায় মস্কো। চেচনিয়া পরিণত হয় রাশিয়ার একটি অঞ্চলে।

২০০৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন–পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ রমজান কাদিরভের বিরুদ্ধে উঠেছে। তাঁর সমালোচনাকারী অনেক সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসবের জেরে ২০১৭ সালে রমজানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে রমজান কাদিরভের রাজনৈতিক বোঝাপড়া রয়েছে বলে মনে করছেন রুশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরামর্শক কনস্ট্যানটিন ভন এগার্ট। তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পুতিনের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন রমজান। বিপরীতে মস্কো থেকে বড় আর্থিক সুবিধা পেয়েছে চেচনিয়া প্রজাতন্ত্র।

আরও দেখুনঃ
- খুনী রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর জন্য মার্কিন সরকারের সহযোগিতা কামনা
- কাল জাতীয় শোক দিবস : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭ তম শাহাদত বার্ষিকী
- নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন : ওবায়দুল কাদের
- অ্যাপ ভিত্তিক জেনারেটর সার্ভিস নিয়ে এলো এ সি আই মটরস্
- বিএনপি সহিংসতা আগুন সন্ত্রাস শুরু করলে রাজপথে মোকাবেলা করা হবে : ওবায়দুল কাদের
- শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম শাহাদত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালিত






