প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কলেজছাত্রীকে অপহরণ, কুয়াকাটা থেকে উদ্ধার ও দুই সহযোগী আটক

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা থেকে অপহৃত ১৭ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রীকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটার একটি আবাসিক হোটেল থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মূল আসামির দুই সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। প্রেমের প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অভিযুক্ত যুবক তার বন্ধুদের সহায়তায় ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক অপহরণ করেছিলেন বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। এই ঘটনায় গত বুধবার ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

অপহরণের প্রেক্ষাপট ও মামলার বিবরণ

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানার বাসিন্দা মো. ছালাউদ্দিন মেম্বারের ছেলে মো. জাবেদ (২২) দীর্ঘদিন ধরে ওই কলেজছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্ত করাসহ কুপ্রস্তাব দেওয়ায় ছাত্রীটি বিষয়টি তার পরিবারকে অবহিত করেন। পরিবার জাবেদের বাবাকে বিষয়টি জানালে জাবেদ চরম ক্ষিপ্ত হয় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে।

গত বুধবার (৬ মে, ২০২৬) বিকেলে ওই ছাত্রী তার এক বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে দুলারহাট বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে অপহৃত হন। মামলার প্রধান আসামি জাবেদ তার দুই বন্ধু হাসনাইন (২১) ও মেহেদী হাসানের সহযোগিতায় তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। এই ঘটনায় ছাত্রীর মা বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে চরফ্যাশন থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলায় জাবেদকে প্রধান আসামি এবং তার বাবা ছালাউদ্দিন মেম্বারকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে।

অপহরণের রুট ও পুলিশের উদ্ধার অভিযান

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, অপহরণকারীরা ওই ছাত্রীকে নিয়ে প্রথমে ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাটে পৌঁছান। সেখান থেকে দ্রুত গতির স্পিডবোটযোগে তারা বরিশাল যান। বরিশাল থেকে একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে তারা পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কুয়াকাটায় পৌঁছে তারা ‘রূপান্তর’ নামক একটি আবাসিক হোটেলে ভুয়া তথ্য দিয়ে কক্ষ ভাড়া নেন।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর চরফ্যাশন থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ করে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করার পর মহিপুর থানা পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বৃহস্পতিবার (৭ মে) দিবাগত মধ্যরাতে ওই আবাসিক হোটেলে হানা দিয়ে পুলিশ অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। অভিযানের সময় জাবেদের দুই সহযোগী হাসনাইন ও মেহেদী হাসানকে পুলিশ আটক করলেও মূল অভিযুক্ত জাবেদ পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে পালিয়ে যান।

আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার (৮ মে) রাতে চরফ্যাশন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপহরণকারীদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে কুয়াকাটা থেকে ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। আটককৃত দুই আসামি হাসনাইন ও মেহেদীকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা অপহরণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জাবেদকে সহায়তার কথা স্বীকার করেছে।

চরফ্যাশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদ আল ফরিদ ভূঁইয়া জানান, উদ্ধার হওয়া কলেজছাত্রী এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের নিয়ে পুলিশের একটি দল ইতিমধ্যে চরফ্যাশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ভুক্তভোগী ছাত্রীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং আসামিদের আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অপহরণের মূল হোতা জাবেদ এবং মামলার অপর আসামি ছালাউদ্দিন মেম্বারকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি ও সামাজিক উদ্বেগ

উদ্ধার হওয়া ছাত্রীর মা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, জাবেদ পরিকল্পিতভাবে তার বন্ধুদের ব্যবহার করে এই অপহরণ ঘটিয়েছে এবং এতে জাবেদের বাবার প্রচ্ছন্ন ইন্ধন রয়েছে।

পেশাদার অপরাধী না হয়েও কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ ও প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে একজন ছাত্রীকে যেভাবে ফিল্মি কায়দায় জনসম্মুখ থেকে অপহরণ করা হয়েছে, তা স্থানীয় জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আবাসিক হোটেলগুলোতে অতিথিদের সঠিক তথ্য যাচাই না করে কক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। পুলিশ জানিয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে এবং পলাতক আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে।