১২ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত বৃদ্ধ সপরিবারে পলাতক

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার এক চাঞ্চল্যকর ও নর্থনকাজনক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ৬৫ বছর বয়সী প্রতিবেশী বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম ওরফে দয়াল বর্তমানে সপরিবারে পলাতক রয়েছেন। ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ফুলবাড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার আসামি নুরুল ইসলাম পেশায় একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী এবং শিশুর প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে তাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ধর্ষণের বিবরণ

মামলার এজাহার এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশুটির মা একজন দিনমজুর এবং বাবা দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ। অভাবের সংসারে পিতামাতার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আসামি নুরুল ইসলাম শিশুটিকে বিভিন্ন প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে শিশুটি তার নানির জন্য দোকান থেকে পান কিনতে যাওয়ার পথে নুরুল ইসলাম তাকে মুখ চেপে ধরে একটি ভুট্টাখেতে নিয়ে গিয়ে প্রথমবার ধর্ষণ করেন। পরবর্তীতে এই বিষয়টি কাউকে জানালে শিশুটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত ৫ ফেব্রুয়ারি নুরুল ইসলাম পুনরায় শিশুটিকে ফুসলিয়ে গ্রামের পাশে একটি ভুট্টাখেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পাশবিক নির্যাতনের ফলে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তার পরিবারের সদস্যরা। মাসখানেক আগে স্থানীয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় যে, ১২ বছর বয়সী ওই শিশুটি বর্তমানে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

আপস-মীমাংসার চেষ্টা ও কথিত বিয়ের নাটক

শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সংবাদ জানাজানি হলে অভিযুক্ত নুরুল ইসলাম আইনি জটিলতা এড়াতে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সপ্তাহখানেক আগে গ্রাম্য সালিসের মাধ্যমে একটি বেআইনি আপস-মীমাংসার আয়োজন করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাদের দেড় লাখ টাকা এবং দুই শতক জমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মীমাংসার নাটক সাজানো হয়।

এমনকি ৬৫ বছর বয়সী অভিযুক্ত বৃদ্ধের সাথে ১২ বছর বয়সী শিশুটির একটি কথিত বিয়ের ব্যবস্থাও করা হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি সাদা কাগজে ওই শিশুর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ভুক্তভোগী শিশুর অসুস্থ বাবা জানান, মান-সম্মানের ভয় এবং স্থানীয় কিছু ব্যক্তির চাপের মুখে তিনি শুরুতে এই মীমাংসায় রাজি হয়েছিলেন। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো টাকা বা জমি তারা পাননি। বর্তমানে তিনি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নুরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

পুলিশের বক্তব্য ও আইনগত পদক্ষেপ

ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আব্দুল লতিফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, শিশুটি বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা এবং বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তিনি আরও জানান, অপরাধটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে যে আপস-রফার চেষ্টা চালানো হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ বেআইনি। পুলিশ সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে নুরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি যারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বেআইনি সালিস বা আপস-মীমাংসার সাথে জড়িত ছিলেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভুক্তভোগী শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়

দিনাজপুরের এই ঘটনাটি গ্রামীণ জনপদে শিশুদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার নামে চলা বেআইনি কার্যকলাপের কদর্য রূপটি সামনে নিয়ে এসেছে। অভাবগ্রস্ত ও অসহায় পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১২ বছরের একটি শিশুর শৈশব যেখানে পড়াশোনা ও খেলাধুলায় কাটানোর কথা, সেখানে তাকে এক বৃদ্ধের লালসার শিকার হয়ে মাতৃত্বের বোঝা বহন করতে হচ্ছে—যা এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত সকলের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, অপরাধী কোনোভাবেই পার পাবে না এবং শিশুটির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বর্তমানে শিশুটি এবং তার পরিবার পুলিশি পাহারায় রয়েছে এবং অভিযুক্তের সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, প্রান্তিক জনপদে শিশু সুরক্ষা ও আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করা কতটা অপরিহার্য।