দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ টানা তৃতীয়বার শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এক নতুন ও চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ধরে রাখার এই লড়াইয়ে এবার বাংলাদেশের গন্তব্য ভারতের পর্যটন নগরী গোয়া। তবে মূল প্রতিযোগিতায় মাঠে নামার আগে কন্ডিশনিং এবং কৌশলগত প্রস্তুতির লক্ষ্যে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১৫ দিনের একটি নিবিড় প্রস্তুতি ক্যাম্প করবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। আগামীকালই একটি শক্তিশালী ও পুনর্গঠিত স্কোয়াড নিয়ে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে দেশ ছাড়বে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
Table of Contents
স্কোয়াডে বড় বিবর্তন ও কোচের কঠোর অবস্থান
এবারের সাফের জন্য ঘোষিত ২৩ সদস্যের স্কোয়াডে বড় ধরনের রদবদল এসেছে, যা দেশের ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দলের নিয়মিত দুই মুখ স্বপ্না রানী ও মুনকি আক্তারের বাদ পড়াটি ছিল সবচেয়ে বড় চমক। গত দুই আসরে শিরোপাজয়ী দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও এবার তাঁদের ঠাঁই হয়নি চূড়ান্ত তালিকায়।
গত রোববার বাফুফে ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলের ব্রিটিশ প্রধান কোচ পিটার বাটলার তাঁর এই কঠোর সিদ্ধান্তের নেপথ্যে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। বাটলার স্পষ্ট করে জানান যে, দলের মধ্যে তিনি উচ্চমানের পারফরম্যান্স এবং কঠোর শৃঙ্খলাবোধ দেখতে চান। তাঁর মতে, স্বপ্না ও মুনকি বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত ছন্দে নেই এবং মাঠের নির্দেশনার ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে অপেশাদার আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। কোচ আরও যোগ করেন যে, খেলোয়াড়দের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার স্বার্থেই এই কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তাঁরা জাতীয় দলের গুরুত্ব এবং পেশাদারিত্ব বুঝতে সক্ষম হন। বর্তমানে এই দুই খেলোয়াড়কে অনুশীলনের মূল গ্রুপ থেকেও বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
ভারতের মাটিতে চ্যালেঞ্জ ও প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ
অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ আগামী ২৫ মে ভারতের গোয়ায় পর্দা উঠতে যাচ্ছে। বিগত দুটি আসরে নেপালের মাটিতে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জয় করলেও এবারের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার লড়াই হবে এই আসরের সবচেয়ে সফল দল ভারতের ঘরের মাঠে। ভারত নারী ফুটবল দল ইতোমধ্যেই পাঁচবার এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে। নিজ দেশের দর্শকদের সামনে শিরোপা পুনরুদ্ধারের জন্য তারা এবার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
কোচ পিটার বাটলার ও নতুন অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাননি। কোচ সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এবারের আসরে বাংলাদেশ দল গত দুইবারের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ভারতের শক্তিমত্তা এবং নেপাল ও ভুটানের মতো দলগুলোর সাম্প্রতিক উত্থানকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দলই এখন ট্যাকটিক্যালি এবং ফিজিক্যালি অনেক বেশি সুসংগঠিত, যা হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের পথকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
ব্যাংকক সফর ও কন্ডিশনিং ক্যাম্পের পরিকল্পনা
ভারতের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যাংককের এই ১৫ দিনের ক্যাম্পটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সূচি অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে থাকাকালীন ১০ এবং ১৭ মে দুটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। কোচের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ম্যাচগুলো নতুন খেলোয়াড়দের পরখ করে দেখার এবং দলের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার শেষ সুযোগ। এরপর ২১ মে ব্যাংকক থেকেই সরাসরি ভারতের গোয়ায় পৌঁছাবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
অভিজ্ঞতার বিসর্জন ও তারুণ্যের জয়গান
২০২৪ সালের এই সাফ মিশনে বাংলাদেশের স্কোয়াডে এক বড় ধরনের রূপান্তর লক্ষ্য করা গেছে। আগের আসরের নিয়মিত ২৩ জনের মধ্যে ১০ জনই এবার বাদ পড়েছেন। দলের একসময়ের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রানী সরকার, মিডফিল্ডার সানজিদা আক্তার এবং রক্ষণভাগের নির্ভরযোগ্য নাম মাসুরা পারভীন বিভিন্ন কারণে স্কোয়াডের বাইরে রয়েছেন। এছাড়া ইনজুরির কারণে দল থেকে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নবীরন খাতুন।
অভিজ্ঞদের এই শূন্যস্থান পূরণে কোচ বাটলার একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণীকে সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন স্বর্ণা রানী, হালিমা খাতুন ও সুরভী আকন্দ প্রীতি। এছাড়া একদম নতুন মুখ হিসেবে অর্পিতা বিশ্বাস ও মোমিতা খাতুন স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। কোচের বিশ্বাস, এই তরুণ ফুটবলারদের উদ্দীপনা ও গতিশীলতা টুর্নামেন্টে বাংলাদেশকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
সাফের জন্য ঘোষিত চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের বাংলাদেশ স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: রুপনা চাকমা, মিলি আক্তার।
রক্ষণভাগ: শিউলি আজিম, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), সুরমা জান্নাত, কোহাতি কিসকু, উন্নতি খাতুন, অর্পিতা বিশ্বাস।
মধ্যভাগ: মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা, শাহেদা আক্তার রিপা, ঋতুপর্ণা চাকমা, হালিমা আক্তার, মোমিতা খাতুন, আনিকা রানী সিদ্দিকী।
আক্রমণভাগ: শামসুন্নাহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়র, সুরভী আকন্দ প্রীতি, উমেহ্লা মারমা, মোছাম্মৎ সাগরিকা, তহুরা খাতুন, স্বর্ণা রানী মন্ডল।
এক নতুন নেতৃত্বের ছায়ায় এবং শৃঙ্খলার কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে কতটা সক্ষম হয়, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে ফুটবলপ্রেমীরা। তারুণ্য আর সাহসের সংমিশ্রণে তৈরি এই নতুন দলটিই হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রণকৌশল।