বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যে বড় ধস: ভূ-রাজনীতি ও শক্তিশালী ডলারের বহুমুখী প্রভাব

আন্তর্জাতিক বাজারে মহামূল্যবান ধাতু স্বর্ণের মূল্যে বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে বিদ্যমান অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের সম্মিলিত প্রভাবে এই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সোমবার (৪ মে ২০২৬) আন্তর্জাতিক বাজার খোলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্বর্ণের দাম ১ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।


আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান পরিসংখ্যান ও তথ্য

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) সকাল ১১টা ৪০ মিনিট নাগাদ ‘স্পট গোল্ড’ বা তাৎক্ষণিক বাজারে স্বর্ণের দাম ১.৩% কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৫৩ ডলার ৫৩ সেন্টে নেমে এসেছে। একইভাবে মার্কিন গোল্ড ফিউচার বাজারেও এই পতনের রেশ দেখা গেছে; সেখানে স্বর্ণের দাম ১.৭% হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৬৫ ডলার ৪০ সেন্টে লেনদেন হতে দেখা যায়।

স্বর্ণের দরপতনের সমান্তরালে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে রুপার দাম ৩.১% কমে প্রতি আউন্স ৭৩ ডলার ৪ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত মূল্যবান ধাতু প্লাটিনামের দাম ২.৫% এবং প্যালাডিয়ামের দাম ৩.৫% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।


হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও তেলের বাজারের অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা স্বর্ণের বাজারকে অস্থিতিশীল করার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ দাবি করেছে যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দ্রুতই এই দাবিটিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১১৩ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। তেলের উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে স্বর্ণের মতো নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে।


মার্কিন ডলারের প্রভাব ও বিনিয়োগকারীদের কৌশল পরিবর্তন

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের চেয়ে মার্কিন ডলারকে অধিক নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করছেন। বায়বিটের প্রধান বাজার বিশ্লেষক হান ট্যান এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির মুখে বিনিয়োগকারীরা এখন ডলারের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

এর পাশাপাশি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (ফেড)-এর সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলছে। ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিলেও, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুদের হার উচ্চ থাকলে স্বর্ণের মতো সুদমুক্ত সম্পদের আকর্ষণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কমে যায়, যা দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।


বৈশ্বিক বাজারের সীমাবদ্ধতা ও লেনদেন চিত্র

সোমবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণের লেনদেনের গতি তুলনামূলক মন্থর ছিল। এর প্রধান কারণ হিসেবে এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি প্রধান বাজারে সরকারি ছুটি থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে। চীন, জাপান এবং যুক্তরাজ্যে সরকারি ছুটি থাকায় স্বর্ণের বাজারের বড় বিনিয়োগকারীদের একটি বিশাল অংশ লেনদেনে অংশ নিতে পারেনি। বাজারের এই তারল্য সংকট দামের ওঠানামাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।


বাংলাদেশের বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব ও বাজুসের প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের এই ব্যাপক দরপতনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে স্বর্ণের মূল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করে থাকে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের একমাত্র বৈধ সংগঠন ‘বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (বাজুস)। সাধারণত বাজুস আন্তর্জাতিক বাজারের ট্রেন্ড এবং স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বিশ্লেষণ করে নিয়মিত বিরতিতে স্বর্ণের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের এই নিম্নমুখী প্রবণতা আগামী কয়েক দিন স্থিতিশীল থাকে, তবে বাজুস স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বাজুস পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অচিরেই নতুন দরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্রাহকদের জন্য অলঙ্কার ক্রয় বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।