সুনামগঞ্জে ধান সংগ্রহে বিপর্যয়: সরকারি মূল্য ও প্রান্তিক চাষিদের বাস্তব সংকট

 বাংলাদেশের প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে সরকারের নির্ধারিত ন্যায্যমূল্য এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবদরের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান সাধারণ কৃষকদের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার প্রতি মণ ধানের সংগৃহীত মূল্য ১,৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বহুমুখী সংকটে পড়ে প্রান্তিক চাষিরা তা মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক চাপের এই দ্বিমুখী কশাঘাতে বর্তমানে নিঃস্ব হওয়ার পথে সুনামগঞ্জের কয়েক লক্ষ কৃষক পরিবার।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও উৎপাদন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

গত কয়েকদিনের অবিরাম অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ি ঢলে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা ফসল তলিয়ে গেছে। কৃষকরা নিজেদের শেষ সম্বল রক্ষায় দিনরাত পরিশ্রম করে কিছু ধান কাটতে পারলেও, নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে রোদের অভাব। হাওরাঞ্চলে ধান মাড়াইয়ের পর তা শুকানোর জন্য কৃষকরা সম্পূর্ণভাবে রোদ ও উন্মুক্ত ‘খলা’র ওপর নির্ভরশীল।

দীর্ঘদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় এবং পর্যাপ্ত রোদ না মেলায় খলায় স্তূপ করে রাখা ভেজা ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে। বৃষ্টির পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজে থাকার ফলে ধানের স্বাভাবিক উজ্জ্বল বর্ণ নষ্ট হয়ে কালচে হয়ে যাচ্ছে এবং এর গুণগত মান মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বাজারে এই মানহীন বা ভেজা ধানের চাহিদা না থাকায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

মজুরি সংকট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুমে বাইরের জেলা থেকে আসা হাজার হাজার শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা কৃষকদের জন্য এক বিশাল দায়বদ্ধতা। বর্তমান মৌসুমে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং আনুষঙ্গিক খরচের কারণে কৃষকদের হাতে নগদ অর্থের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। ঘরে খাবার নেই, তার ওপর পাওনাদারের চাপ—এই পরিস্থিতি কৃষকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। ফলে ধান শুকিয়ে গুদামজাত করার বা সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার মতো সময় ও সামর্থ্য কোনোটিই এখন তাদের হাতে নেই।

কৃষকদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে স্থানীয় একদল অসাধু পাইকার এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা মাঠ পর্যায় থেকে নামমাত্র মূল্যে অর্থাৎ সরকারি দরের অর্ধেকেরও কম দামে ধান কিনে নিচ্ছে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ যেখানে প্রতি মণে ১,০০০ টাকার কাছাকাছি, সেখানে ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করা মানেই হলো ভিটেমাটি হারানোর উপক্রম হওয়া। অথচ অসাধু ব্যবসায়ীরা এই ধানই পরে প্রক্রিয়াজাত করে সরকারের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটে নেয়।

সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেই গত ৩ মে (রবিবার) থেকে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু করেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা হিসেবে মণপ্রতি ১,৪৪০ টাকা প্রদান করছে সরকার।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বি.এম মুশফিকুর রহমান জানান, সরকার চায় প্রকৃত কৃষকরাই যেন এই মূল্যের সুফল পান। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি গুদামে ধান জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্দ্রতার একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড (সাধারণত ১৪%) বজায় রাখতে হয়। বর্তমান বৈরী আবহাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে এই মানদণ্ড পূরণ করে ধান শুকানো প্রায় অসম্ভব। ফলে সরকারি সংগ্রহ কেন্দ্রগুলো কৃষকদের জন্য কার্যত অকেজো হয়ে পড়ছে এবং পরোক্ষভাবে তা ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিচ্ছে।

কৃষকদের দাবি ও সম্ভাব্য সমাধান

হাওরের কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো, দুর্যোগকালীন সময়ে ধান সংগ্রহের নীতিমালা কিছুটা শিথিল করা। তাদের মতে, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হলে:

  • প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করে সরাসরি তাদের বাড়িতে গিয়ে বা নিকটস্থ অস্থায়ী কেন্দ্র থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে।

  • ধানের আর্দ্রতা পরিমাপের ক্ষেত্রে বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিবেচনায় কিছুটা ছাড় দিতে হবে অথবা সরকারি উদ্যোগে ধান শুকানোর ‘ড্রায়ার মেশিন’ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।

  • সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই যেন মধ্যস্বত্বভোগী বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি মূলত এই এক ফসলি বোরো ধানের ওপর টিকে আছে। যদি সময়মতো কৃষকদের এই আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকার কেবল কাগুজে মূল্য নির্ধারণ না করে মাঠ পর্যায়ের সংকট নিরসনে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।