শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী পাহাড়ের ঢাল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্য হাতির দল নিয়মিত চলাচলের কারণে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে পরিপক্ব হওয়ার আগেই বোরো ধান কেটে নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন শ্রম ও খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গন্দিগাঁও গ্রামের রাজিব কোচ (৪৮) গজনী পাহাড়ের ঢালে ৬০ শতক জমিতে ১৬ হাজার টাকা ব্যয়ে বোরো ধান আবাদ করেন। তাঁর ধান এখনো পুরোপুরি পাকার জন্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন সময় প্রয়োজন ছিল। তবে পাহাড়ি এলাকায় বন্য হাতির উপস্থিতির কারণে তিনি ৭০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে ছয়জন শ্রমিক নিয়ে দ্রুত ধান কেটে নিচ্ছেন। রাজিব কোচ পেশায় অটোরিকশা চালক এবং স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার।
তিনি জানান, হাতির দল এলাকায় অবস্থান করায় ঝুঁকি নিয়ে ধান রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, এক রাতেই পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ আশপাশের অনেক জমির ফসল ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার কয়েকশ কৃষক। গত এক সপ্তাহে ঝিনাইগাতীর গজনী, গন্দিগাঁও ও বাঁকাকুড়া এলাকায় ২০ থেকে ২৫ জন কৃষকের প্রায় ৫ একর জমির ধান বন্য হাতির দল খেয়ে ও মাড়িয়ে নষ্ট করেছে।
নিম্নে ক্ষয়ক্ষতির একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| এলাকা | ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক | ক্ষতিগ্রস্ত জমি | ক্ষতির ধরন |
|---|---|---|---|
| গজনী | একাধিক | প্রায় ৫ একর (মোট) | খাওয়া ও মাড়ানো |
| গন্দিগাঁও | কয়েকজন | অন্তর্ভুক্ত | আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতি |
| বাঁকাকুড়া | কয়েকজন | অন্তর্ভুক্ত | আংশিক ক্ষতি |
বন বিভাগের স্থানীয় কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি হাতির একটি দল এলাকায় চলাচল করছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫টি শাবক রয়েছে। দলটি এক সপ্তাহ ঝিনাইগাতী এলাকায় অবস্থান করার পর বর্তমানে নালিতাবাড়ীর সমশ্চূড়া জঙ্গলের দিকে চলে গেছে।
কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তিনটি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় মোট ৮ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীবরদীতে ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর, ঝিনাইগাতীতে ২ হাজার ২৪০ হেক্টর এবং নালিতাবাড়ীতে ২ হাজার ১১৬ হেক্টর জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমির ধান এখন পরিপুষ্ট হলেও পরিপক্ব হতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে।
ঝুঁকির কারণে কৃষকেরা আগেভাগে ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গন্দিগাঁও গ্রামের কৃষক লাল কৃষ্ণ কোচ (৩৭) জানান, তাঁর এক একর জমির ধান দুই রাতেই হাতির দল নষ্ট করে দিয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণের জন্য বন বিভাগের কাছে আবেদন করেছেন। ওই সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, অন্তত পাঁচজন কৃষক ইতোমধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দিয়েছেন।
অন্যদিকে সমশ্চূড়া এলাকার একজন কর্মকর্তা জানান, হাতির দল বর্তমানে সমশ্চূড়া ও বাতকুচি জঙ্গলে অবস্থান করছে। লোকালয়ে যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পাহারা ও নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ কাজে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা যুক্ত আছেন।
গজনী, রাংটিয়া, তাওয়াকুচা, মধুটিলা ও বারমারি এলাকার বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, কোথাও কাঁচা, কোথাও আধা পাকা এবং কোথাও পরিপক্ব ধান দ্রুত কেটে ফেলা হচ্ছে। কৃষকেরা মূলত ক্ষতির আশঙ্কা থেকে বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
