ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা নিরসনে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফআইআর) শীর্ষ কর্মকর্তারা খুব শীঘ্রই ফিফার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এই বৈঠকের ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি ইরান ও ফিফার মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্ব ঘোচানোর সর্বশেষ চেষ্টা হতে পারে।
Table of Contents
ভ্যাঙ্কুভার কংগ্রেস ও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন
গত বৃহস্পতিবার কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ফিফার বার্ষিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকাপের প্রাক্কালে বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করলেও ইরানের প্রতিনিধিদল সেখানে উপস্থিত হতে পারেনি। জানা গেছে, ইরানের প্রতিনিধিরা ভ্যাঙ্কুভারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেও টরন্টো বিমানবন্দরে কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে ‘অগ্রহণযোগ্য আচরণ’ করে। এই অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের প্রতিবাদে ইরানি কর্মকর্তারা কংগ্রেস বর্জন করে নিজ দেশে ফিরে যান।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদী তাজ গত শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ফিফার সঙ্গে আলোচনার অনেক বিষয় জমে আছে এবং তারা শীঘ্রই একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইএসপিএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার মহাসচিব মাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম ইরানি প্রতিনিধিদলকে আগামী ২০ মের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফার সদর দপ্তরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি ও ফিফার অবস্থান
ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে সংকটের মূল কারণ নিহিত রয়েছে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ফুটবল ফেডারেশন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কোনো ম্যাচ খেলতে ইচ্ছুক নয়। নিরাপত্তার অভাব এবং রাজনৈতিক বিরোধের কথা উল্লেখ করে তারা বিশ্বকাপের ইরানের ম্যাচগুলো বিকল্প কোনো ভেন্যুতে স্থানান্তরের আবেদন জানায়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ বিশ্বকাপ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের বেশিরভাগ ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও খেলোয়াড়দের সুরক্ষার প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এ বিষয়ে ইরানের আবেদনে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কয়েকবারই জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রতিটি দলকেই পূর্বনির্ধারিত ভেন্যুতে খেলতে হবে। ভ্যাঙ্কুভার কংগ্রেসেও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ইরান বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং তাদের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই অনুষ্ঠিত হবে।
বাছাইপর্বের সাফল্য বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইরান ফুটবল দল এশিয়া অঞ্চলের বাছাই পর্বে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট অর্জন করেছে। মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করলেও এখন মাঠের বাইরের রাজনৈতিক মেরুকরণ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান মনে করে, যে দেশের সঙ্গে তাদের সামরিক সংঘাত চলছে, সেই দেশে গিয়ে খেলা তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার পরিপন্থী হতে পারে।
অন্যদিকে, ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী খেলাধুলা ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট এতটাই জটিল যে কোনো সহজ সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী ২০ মে জুরিখে অনুষ্ঠেয় বৈঠকটি তাই উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি ফিফা ইরানের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং ইরান তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ইরানের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলে এর সম্ভাব্য প্রভাব
ইরানের মতো একটি শক্তিশালী ও জনসমর্থনপুষ্ট দল যদি বিশ্বকাপ বর্জন করে বা অংশ নিতে না পারে, তবে তা ফুটবলের এই বৈশ্বিক আসরের জৌলুসে কিছুটা ভাটা ফেলবে। বিশেষ করে এশীয় ফুটবলের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা সচরাচর তাদের ঘোষিত ভেন্যু বা সূচি পরিবর্তন করে না, যা ইরানের দাবি পূরণের পথে একটি বড় অন্তরায়। তবে ফিফা যদি কোনো বিশেষ নিরাপত্তা প্রোটোকল বা মধ্যস্থতামূলক সমাধান নিয়ে আসতে পারে, তবেই হয়তো এই সংকটের সমাধান সম্ভব। ২০ মের জুরিখ বৈঠকের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে সমগ্র ফুটবল বিশ্ব।
