নীলফামারী জেলায় অবস্থিত উত্তরা ইপিজেডের বৃহৎ চশমা ও অপটিক্যাল ফ্রেম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাজেন (বিডি) লিমিটেড তাদের সকল কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। বুধবার বিকেলে কারখানা কর্তৃপক্ষ এক লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঘোষণাটি প্রদান করে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দাভাব এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কারখানাটি পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
Table of Contents
কার্যক্রম স্থগিতের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট
কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ উল্লেখ করেছে। ম্যাজেন (বিডি) লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন) এরেন লি স্বাক্ষরিত নোটিশ অনুযায়ী, কারখানাটি বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটায় চশমা তৈরির অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রধান ক্রেতাদের (বায়ার) পক্ষ থেকে নতুন ক্রয় আদেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কাঁচামাল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত অর্ডার না থাকায় কারখানার নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছিল। ফলস্বরূপ, কারখানাটি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া রোধে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইনি কাঠামো ও শ্রমিকদের সুবিধাসমূহ
কারখানা বন্ধের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯-এর ১৫ ধারা মোতাবেক বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই লে-অফ কার্যকর থাকবে।
নোটিশে শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে জানানো হয়েছে যে, এই লে-অফ চলাকালীন কোনো শ্রমিক বা কর্মচারীকে সশরীরে কারখানায় উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বেতন ও ভাতাদি পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকরা আইন মোতাবেক তাদের পাওনা অর্থ যথা সময়ে বুঝে পাবেন।
পাশাপাশি, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে শ্রমিক-কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, আগামী ৭ মে থেকে ১৪ মে-এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের উৎসব ভাতা বা বোনাস সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
ইপিজেড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উত্তরা ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এই লে-অফের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কাঁচামালের ঘাটতি এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ম্যাজেন বিডি কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এটি কোনো স্থায়ী বন্ধের সিদ্ধান্ত নয়। তিনি বলেন, “কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক হলে এবং আন্তর্জাতিক বায়ারদের পক্ষ থেকে নতুন ক্রয় আদেশ পাওয়া গেলে কারখানাটি আবারও তার পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদন শুরু করবে।” ইপিজেড কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে যাতে দ্রুততম সময়ে শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারেন।
ম্যাজেন বিডি লিমিটেডের জনবল ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ম্যাজেন (বিডি) লিমিটেড নীলফামারী অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে এই কারখানায় দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৩৬১ জন দক্ষ শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। এর বাইরেও কারিগরি সহায়তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে ৯৬ জন চীনা নাগরিক কর্মরত রয়েছেন।
রপ্তানিমুখী এই চশমা তৈরির কারখানাটি উত্তরা ইপিজেডের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা সরাসরি এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলা সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। নীলফামারী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বৈশ্বিক পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির মাধ্যমে এই বৃহৎ কর্মস্থলটি পুনরায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পুনরায় অবদান রাখবে।
