ঢাকার কেরানীগঞ্জে অটোরিকশাচালক মুকুল হোসেন চকলেটকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তার অটোরিকশা ডাকাতি করার দায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক এ বি এম আশফাক-উল হক এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে একই মামলায় অভিযুক্ত অপর পাঁচজন আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
Table of Contents
দণ্ডিত আসামিদের পরিচয় ও আদালতের নির্দেশনা
আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— ফেরদৌস ওরফে বারেক ওরফে ভাতিজা, সোহেল ওরফে জুয়েল, শাহিন হাওলাদার, সুমন ওরফে আল আমিন এবং কবির। রায়ে বিচারক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আসামিদের প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করতে হবে। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্বে উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট) অনুমোদন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেই লক্ষ্যে মামলার যাবতীয় নথি অতিদ্রুত হাইকোর্ট বিভাগে প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
রায় ঘোষণার সময় কারাগারে আটক থাকা দুই আসামি শাহিন হাওলাদার ও ফেরদৌস ওরফে বারেককে পুলিশি পাহারায় আদালতে হাজির করা হয়। রায় প্রদান শেষে সাজা পরোয়ানামূলে তাদের পুনরায় করাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, জামিনে থাকা অপর তিন আসামি—সুমন, কবির ও সোহেল সকালে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজিরা জমা দিলেও রায় ঘোষণার সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। নির্ধারিত সময়ে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারায় আদালত তাদের পলাতক ঘোষণা করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ নিয়মিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মামলার বিবরণ
মামলার এজাহার এবং আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত মুকুল হোসেন চকলেট ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকায় ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০২০ সালের ২৭ জুন দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে তিনি অটোরিকশা নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। সাধারণ নিয়মে রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে তার বাসায় ফেরার কথা থাকলেও ওই রাতে তিনি আর ফেরেননি। দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকায় পরিবারের সদস্যরা তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পরদিন ২৮ জুন সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কোনাখোলা-রাজাবাড়ী সড়কের বার্তা ব্রিজের নিকটবর্তী স্থান থেকে মুকুলের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই আবু হানিফ বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা ও ডাকাতির মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ
মামলাটির ছায়া তদন্ত ও চূড়ান্ত তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই-এর উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আনোয়ার হোসেন মামলার রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, আসামিরা অটোরিকশাটি ছিনতাই বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে মুকুলকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ রাস্তায় ফেলে যায়। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে লুণ্ঠিত অটোরিকশাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। বিচার চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ২৬ জন সাক্ষীর নাম প্রস্তাব করলেও আদালত ১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করেন।
আইনি বিশ্লেষণ ও বিচারকের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন যে, এটি একটি ঠাণ্ডা মাথার সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। জীবিকার অন্বেষণে বের হওয়া একজন শ্রমজীবী মানুষকে সামান্য সম্পদের লোভে নির্মমভাবে হত্যা করা সমাজের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর ও উদ্বেগের বিষয়। আসামিদের অপরাধের গুরুত্ব ও বর্বরতা বিবেচনা করে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।
পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে লুণ্ঠিত অটোরিকশা উদ্ধার এবং ঘটনার সময় আসামিদের ডিজিটাল অবস্থান শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৫ জন সাক্ষীর বক্তব্যে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও আসামিদের সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই কঠোর দণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।
