টিকা সংকট মন্তব্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ঘোষণা

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে টিকা সংকট বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ‘ক্লোজ’ করা এবং সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একই ঘটনায় আরেকজন হাসপাতাল কর্মচারীকেও বরখাস্ত করার কথা জানান তিনি।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী এই ঘোষণা দেন। এর আগে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা (র‍্যাবিক্স-ভিসি) সংকটের কারণে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে হচ্ছে।

মন্ত্রীর অভিযোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ

পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গণমাধ্যমে টিকা সংকট বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে এবং তিনি এটিকে “অ্যান্টি-স্টেট অ্যাক্টিভিটি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

মন্ত্রী আরও বলেন, টিকা সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত করেননি। তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্য বিভাগের এমএসআর ফান্ড (ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় তহবিল) এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার সুযোগ ছিল।

পরিদর্শন শেষে তিনি জেলার সিভিল সার্জন এবং একজন হাসপাতাল কর্মচারীর বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন।

টিকা সংকটের প্রেক্ষাপট

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার সংকট থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহ করতে হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীরও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় র‍্যাবিক্স-ভিসি টিকা বিনামূল্যে প্রদান শুরু হয়। তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এই টিকার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। একই সময়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতাভুক্ত কয়েকটি টিকার মজুতও প্রয়োজনের তুলনায় কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যাচ্ছে না এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের নিজ খরচে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

টিকা ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ কাঠামো

বাংলাদেশে টিকা ও ওষুধ সরবরাহ সাধারণত কেন্দ্রীয়ভাবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) এবং সরকারের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে অপারেশনাল প্ল্যান কাঠামো থেকে সরে আসার পর বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু রাখা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত বছর থেকে জলাতঙ্কসহ কিছু টিকার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। প্রতিমাসে মুন্সীগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৬০০ ভায়েল টিকার প্রয়োজন হয় বলে একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, তবে বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ তার চেয়ে কম ছিল বলে দাবি করা হয়।

প্রশাসনিক ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া

একাধিক জেলার সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, টিকা ক্রয় সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে এসব কেনার কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ হলো সরবরাহকৃত টিকা বিতরণ ও সেবা নিশ্চিত করা।

একজন সিভিল সার্জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া জেলা পর্যায়ে টিকা কেনার ব্যবস্থা নেই এবং এ ধরনের দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমদ বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা একটি ভুল দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, টিকা ও চিকিৎসা সামগ্রী সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় পর্যায়ের হওয়া উচিত এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপানো যথাযথ নয়।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে মুন্সীগঞ্জের টিকা সংকট ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ কাঠামো এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও মতবিনিময় অব্যাহত রয়েছে।