রাবি শিক্ষককে ছাত্রদল নেতার হুমকি, ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমিরুল ইসলাম কনককে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি শরিফুল ইসলাম শাকিলের বিরুদ্ধে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি প্রকাশের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

অভিযুক্ত শরিফুল ইসলাম রাবি শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বগুড়া জেলার বাসিন্দা বলে জানা যায়।

ফেসবুক পোস্ট ও মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশট অনুযায়ী, ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমিরুল ইসলাম কনক তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন—

“শকুনিমুক্ত করতে দেড় হাজার প্রাণ ঝরাল, ত্রিশ হাজার আহত হল। কারও নেই জীবন গড়ার পরিকল্পনা। চলছে নেতিকুত্তা আর শকুনের কামড়াকামড়ি।”

এই পোস্টের নিচে প্রথমে শরিফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন একের পর এক মব হচ্ছিল, তখন প্রশাসনে বসে কী করছিলেন?”

এর জবাবে ড. কনক লেখেন, “তোর মত ভেড়াকে ঘাস খাওয়াচ্ছি।”

এরপর শরিফুল ইসলাম আরেকটি মন্তব্য করেন, “শিক্ষক শিক্ষকের মত থাকেন। না হলে কান বরাবর পড়বে।”

এই মন্তব্য প্রকাশের পরই বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

ক্যাম্পাসে প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠন মন্তব্যটির নিন্দা জানায়। শিক্ষার্থীদের একাংশের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে এ ধরনের ভাষায় হুমকি দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক।

রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, ড. আমিরুল ইসলাম কনককে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানধারী ব্যক্তি হিসেবে দেখেন, যিনি অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এমন একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে তিনি দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাবি শাখা পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়।

ছাত্র উপদেষ্টার বক্তব্য

ড. আমিরুল ইসলাম কনক বলেন, তিনি ধারণা করেছিলেন ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হবে এবং ক্যাম্পাসে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাকবে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ও মন্তব্য তাকে মানসিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, মন্তব্যটি তার কাছে অশোভন মনে হয়েছে। তবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি পরে ওই পোস্টের মন্তব্যের অপশন বন্ধ করে দেন। তিনি জানান, বিষয়টি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের অবহিত করবেন।

ছাত্রদল নেতার বক্তব্য

অভিযুক্ত শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তার সঙ্গে ড. আমিরুল ইসলাম কনকের পূর্বের একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময় তাকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে নির্যাতন করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র উপদেষ্টা তাকে “ভেড়া” বলে মন্তব্য করার পরই তিনি উত্তেজিত হয়ে এ ধরনের মন্তব্য করেন।

অভিযোগ অস্বীকার

তবে ড. আমিরুল ইসলাম কনক ছাত্রদল নেতার নির্যাতনের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে তিনি আগে কখনও কিছু শোনেননি। তাঁর মতে, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন এবং তিনি এ ধরনের অভিযোগে বিস্মিত।

সামগ্রিক পরিস্থিতি

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের সীমা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে চলমান পরিস্থিতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।