বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একটি উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র নক্ষত্রের নাম। তিনি একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক এবং শিক্ষক হলেও বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টিসমূহকে বাংলা ভাষায় চারিয়ে দেওয়ার কারিগর হিসেবেই তিনি প্রবাদপ্রতিম হয়ে আছেন। ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের সিলেটে জন্মগ্রহণ করা এই মণীষী বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
Table of Contents
শিক্ষাজীবন ও কর্মের ব্যাপ্তি
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি শুধুমাত্র সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না; তুলনামূলক সাহিত্য, ভারতীয় নন্দনতত্ত্ব এবং ললিতকলার ইতিহাসে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়েছিল মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। সেখানে তিনি পাঠদানের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের পঠন-পাঠনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণ
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো বাংলাভাষী পাঠকদের লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অনেক আগেই, ১৯৭০-এর দশকে মানবেন্দ্র তাঁর অনুবাদ শুরু করেছিলেন। তাঁর সাবলীল ও শক্তিশালী অনুবাদের মাধ্যমেই বাঙালি পাঠক প্রথম ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বা ‘যাদবীয় বাস্তববাদ’-এর স্বাদ পায়। মার্কেসের পাশাপাশি কার্লোস ফুয়েন্তেসের মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের সৃষ্টিও তিনি বাংলায় রূপান্তর করেছেন।
নিচে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও উল্লেখযোগ্য কর্মের একটি তালিকা প্রদান করা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ২৫ এপ্রিল ১৯৩৮, সিলেট। |
| পেশা | অধ্যাপক (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়), অনুবাদক ও লেখক। |
| বিশেষত্ব | লাতিন আমেরিকান সাহিত্য অনুবাদ ও তুলনামূলক সাহিত্য। |
| অনূদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘সরলা এরেন্দিরা’। |
| অন্যান্য অবদান | মার্কেসের নোবেল ভাষণের অনুবাদ, শিশু সাহিত্য সম্পাদনা। |
| মৃত্যু | ৪ আগস্ট ২০২০, কলকাতা (করোনা আক্রান্ত হয়ে)। |
সাহিত্যিক অবদান ও সম্পাদকীয় ভূমিকা
তিনি কেবল বড়দের সাহিত্য নিয়েই কাজ করেননি, ছোটদের জন্য বিদেশি গোয়েন্দা গল্প এবং ধ্রুপদী কাহিনী অনুবাদেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘দশটি উপন্যাস’ বা ‘সেরা বিদেশি গল্প’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধের বইগুলোও বাংলা মননশীল সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর অনুবাদ শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মূল ভাষার নির্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলা ভাষার নিজস্ব ঢঙে তাকে উপস্থাপন করা।
জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার
২০২০ সালের ৪ আগস্ট দীর্ঘ রোগভোগ এবং করোনা আক্রান্ত হয়ে এই মহৎ প্রাণ লেখকের জীবনাবসান ঘটে। কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি বিশাল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে তিনি যে বিশাল সাহিত্যসম্ভার রেখে গেছেন, তা চিরকাল বাংলাভাষী পাঠকদের বিশ্বসাহিত্যের অলিগলিতে ভ্রমণের সুযোগ করে দেবে। অনুবাদক হিসেবে তিনি কেবল শব্দান্তর করেননি, বরং সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে বিশ্বজনীনতা আনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
