দেশজুড়ে ডাকাতি, দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহর, মহাসড়ক এবং এমনকি আবাসিক এলাকাগুলোও এখন এসব অপরাধের ঝুঁকির বাইরে নয়। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হামলা, ছিনতাই, লুটপাট কিংবা সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা জনজীবনের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে সারা দেশে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট ৫৭৬টি মামলা হয়েছে। এতে প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ১৯২টি এবং প্রতিদিন ছয়টির বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ২১৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৮০টি এবং মার্চে ১৮১টি মামলা রেকর্ড করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৩ হাজার ৫৪০টি মামলা হয়েছে। ওই সময়ে প্রতিমাসে গড়ে ২২১টির বেশি এবং প্রতিদিন প্রায় আটটি ঘটনা ঘটেছে, যা অপরাধ বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রবণতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
তিন মাসের মামলার পরিসংখ্যান
| মাস | মামলার সংখ্যা |
|---|---|
| জানুয়ারি | ২১৫টি |
| ফেব্রুয়ারি | ১৮০টি |
| মার্চ | ১৮১টি |
| মোট | ৫৭৬টি |
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা এখন আর শুধু মহাসড়ক বা নির্জন রাস্তায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং শহরের ভেতরের আবাসিক এলাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহনেও ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাগেরহাট, ঢাকা ও সিরাজগঞ্জে সংঘটিত কিছু ঘটনায় ছুরিকাঘাত, হত্যা এবং মালামাল লুটের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।
রাজধানী থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত তিন মাসে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১০০টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। নারী, শিশু এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব ঘটনার শিকার হচ্ছেন, যা নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৪৩২টি স্থানকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় সক্রিয় অপরাধীর সংখ্যা প্রায় ৯৭৯ জন বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে সক্রিয় অপরাধী ও এলাকা ভিত্তিক চিত্র
| এলাকা | সক্রিয় অপরাধীর সংখ্যা |
|---|---|
| মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগ | ৩৮৬ জন |
| মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগ | ২১২ জন |
| রমনা ও লালবাগ বিভাগ | ২১৭ জন |
| উত্তরা ও গুলশান বিভাগ | ১৫৪ জন |
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ছিনতাইয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশই যানবাহন ব্যবহার করে সংঘটিত হচ্ছে। প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকে এবং বাকি ১৫ শতাংশ ঘটনায় ছদ্মবেশ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে অপরাধ সংঘটিত করা হয়।
পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০২১ সালে এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৭৯টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৫টিতে। কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়া এই প্রবণতা পরিস্থিতির অবনতিকে নির্দেশ করে।
ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়কগুলোর মধ্যে ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–আরিচা এবং ঢাকা–ময়মনসিংহ সড়ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রুটে রাত ও ভোরের দিকে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধীদের দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাঁদের মতে, শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযান ও বিশেষ নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সামাজিক সহযোগিতাও অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মত দিয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশে ডাকাতি, দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগকে আরও গভীর করে তুলছে।
