দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অনুসৃত শান্তিবাদী প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে বড় ধরনের সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র রপ্তানি নীতিতে শিথিলতা এনে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের ভূমিকা সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে। এই সিদ্ধান্তকে দেশটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা সম্প্রতি নতুন এই নীতিগত কাঠামো অনুমোদন করেছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এখন থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। যদিও সরকার এখনো স্পষ্টভাবে কোন কোন অস্ত্র রপ্তানি করা হবে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি, তবে ধারণা করা হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং যুদ্ধজাহাজও এই তালিকায় থাকতে পারে।
সরকারি ও নীতিগত সূত্র অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে অন্তত সতেরটি দেশ প্রাথমিকভাবে জাপানি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সুযোগ পেতে পারে। পরবর্তী সময়ে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নীতিগত পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র
| বিষয় | পূর্ববর্তী নীতি | নতুন নীতি |
|---|---|---|
| অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি | শুধুমাত্র অ-প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম | যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজসহ বিস্তৃত সামরিক সরঞ্জাম |
| রপ্তানির ক্ষেত্র | অত্যন্ত সীমিত | প্রাথমিকভাবে প্রায় সতেরটি দেশ, ভবিষ্যতে সম্প্রসারণযোগ্য |
| যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি | কার্যত নিষিদ্ধ | শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত |
| বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাড় | প্রায় অনুপস্থিত | জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ছাড়ের সুযোগ |
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিগত পরিবর্তন জাপানের দীর্ঘদিনের ১৯৬৭ সালের কঠোর অস্ত্র রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কাঠামোকে কার্যত পুনর্গঠন করেছে। এতদিন জাপান মূলত অ-প্রাণঘাতী প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে নতুন নীতিতে শর্তসাপেক্ষে আধুনিক ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির পথ খুলে গেছে।
অন্যদিকে, নীতির মধ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণও রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র রপ্তানির ওপর এখনও কঠোর বিধিনিষেধ বজায় থাকবে। পাশাপাশি ক্রয়কারী দেশকে আন্তর্জাতিক সনদের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব অস্ত্র ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পেও ইতোমধ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় জাপানের মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে, যা অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত হবে। এই চুক্তিকে জাপানের প্রতিরক্ষা রপ্তানি সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই নীতিগত পরিবর্তনকে ঘিরে কূটনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি ধর্মীয় স্থানে উৎসর্গ পাঠানো নিয়ে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ ওই স্থানে যুদ্ধপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক উত্তেজনার একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই পদক্ষেপ শুধু প্রতিরক্ষা খাতেই নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে এটি জাপানকে একটি বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
