ফেনীর সোনাগাজীতে সম্প্রতি ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিও অনুসরণ করে ‘ঘরে অকটেন তৈরির চেষ্টা’ করতে গিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—বাস্তবেই কি ঘরে বসে অকটেন তৈরি করা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞ ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর স্পষ্ট উত্তর হলো না। ঘরোয়া পরিবেশে অকটেন তৈরি করা শুধু অসম্ভবই নয়, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনকও।
অকটেন মূলত পেট্রোলিয়াম তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা সাধারণভাবে তেল শোধনাগার বা শিল্পকারখানায় অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রা, উচ্চ চাপ এবং বিশেষ ধরনের অনুঘটক ব্যবহার করা হয়। এসব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ঘরের পরিবেশে থাকা বা নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক অনুঘটক নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপের সীমার বাইরে কার্যকর থাকে না। ফলে শিল্পপরিবেশ ছাড়া এই ধরনের জ্বালানি উপাদান তৈরি করা বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্য একটি শিল্পনিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের বাষ্প খুব সহজেই অগ্নিসংযোগযোগ্য হয়ে থাকে। এর নিম্নমাত্রার অগ্নিসংযোগ তাপমাত্রার কারণে সামান্য ভুল বা অযত্নেই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিশোধিত হাইড্রোকার্বন বাষ্প দীর্ঘ সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে তৈরি বা অশুদ্ধ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে আধুনিক ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ দহন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যন্ত্রপাতির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। ফলে এটি শুধু বিপজ্জনকই নয়, কার্যত অকার্যকরও।
ঘরে অকটেন তৈরির চেষ্টা সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো সংক্ষেপে নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | ঘরোয়া পরিবেশে সীমাবদ্ধতা | সম্ভাব্য ঝুঁকি |
|---|---|---|
| উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ | নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় | বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড |
| রাসায়নিক অনুঘটক | শিল্পমান বজায় রাখা অসম্ভব | বিক্রিয়া ব্যর্থতা ও বিষাক্ত বাষ্প |
| জ্বালানির বাষ্প | নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না | অগ্নিসংযোগ ও দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি |
| শোধন প্রক্রিয়া | জটিল যন্ত্রপাতি প্রয়োজন | যান্ত্রিক বিপর্যয় |
| চূড়ান্ত জ্বালানির মান | অশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি | ইঞ্জিন ক্ষতি ও দূষণ |
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে বা ইউটিউবে দেখা ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বিপজ্জনক রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রয়োগের চেষ্টা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনাটি সেই ঝুঁকিরই একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
