সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুকৌশলে তরুণীদের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের এক লোমহর্ষক ঘটনার মূল হোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগ কর্তৃক গ্রেফতারকৃত এই ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’ বা ক্রমিক ধর্ষকের নাম রাশেদুল ইসলাম রাব্বি (৩০)। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে তার অপরাধের ভয়াবহ ও সুপরিকল্পিত কর্মপদ্ধতি। গত দুই মাসে অন্তত ১৩ জন স্কুল ও কলেজপড়ুয়া তরুণীকে ফাঁদে ফেলে লালসার শিকার বানিয়েছে এই অপরাধী।
Table of Contents
অপরাধের নেপথ্যে অভিনব কৌশল
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ উপস্থাপন করেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রাব্বি প্রথমে ফেসবুকে মেয়ে সেজে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলত। সখ্যতা গভীর হওয়ার পর সে ভিকটিমদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য উপহার দেওয়ার প্রলোভন দেখাত। সে ভিকটিমদের বলত যে, তাদের কোনো বন্ধু বা প্রেমিক তার মাধ্যমে উপহার পাঠিয়েছে।
উপহার গ্রহণের জন্য তরুণীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে আসার অনুরোধ জানাত রাব্বি। সাধারণত রাজধানীর মেট্রো স্টেশন বা সচিবালয় মেট্রো রেল স্টেশনের নিচের এলাকাগুলোকে সে সাক্ষাতের স্থান হিসেবে ব্যবহার করত। ভিকটিম সেখানে পৌঁছানোর পর রাব্বি ফোন করে নিজেকে অসুস্থ দাবি করত এবং নিজের পরিবর্তে তার ‘ফুপাতো ভাই’ বা ‘চাচাতো ভাই’ উপহার নিয়ে আসছে বলে জানাত। মূলত সেই ভাই সেজেই সে নিজে ভিকটিমদের সামনে হাজির হতো।
অপহরণ ও নির্যাতনের আস্তানা
ভিকটিমদের সঙ্গে দেখা করার পর রাব্বি কৌশলে পথ দেখানোর নাম করে বা অন্য কোনো বাহানায় তাদের সিএনজিতে তুলত। এরপর যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ সংলগ্ন এলাকায় তার দুটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যেত। সেখানে নিয়ে তরুণীদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করত এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নির্যাতনের পর রাব্বি ভিকটিমদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিত এবং সেগুলো বিক্রি করে দেওয়ার আগে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিত। পরবর্তীতে এই অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করেই সে নতুন কোনো নারীকে লক্ষ্যবস্তু বানাত, যাতে তদন্তকারী সংস্থা বা অন্য কেউ তাকে সহজে শনাক্ত করতে না পারে।
রাব্বির অপরাধ সংক্রান্ত তথ্যাবলি
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| অভিযুক্তের নাম | রাশেদুল ইসলাম রাব্বি (৩০) |
| ধর্ষণের শিকার (প্রাথমিক তথ্য) | ১৩ জন (স্কুল ও কলেজপড়ুয়া) |
| শনাক্তকৃত ভিকটিম | ১০ জন |
| ব্যবহৃত এলাকা | সচিবালয় মেট্রো স্টেশন, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী (দনিয়া) |
| আস্তানার অবস্থান | দনিয়া কলেজ সংলগ্ন এলাকা (২টি গোপন বাসা) |
| মামলা ও আইনি স্থিতি | ৩টি নিয়মিত মামলা এবং একাধিক জিডি |
| পূর্ববর্তী রেকর্ড | কদমতলী থানায় মামলা ও প্রতারণার অভিযোগ |
তদন্ত ও গ্রেফতার প্রক্রিয়া
গত ৯ মার্চ একজন ভিকটিমের সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তের এক পর্যায়ে মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহায়তায় এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়ারী বিভাগ রাব্বিকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রাব্বি স্বীকার করেছে যে, সে তার বর্তমান স্ত্রীকেও একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছে। ভিকটিমদের অধিকাংশেরই আবাসন মিরপুর এলাকায়।
ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, লোকলজ্জা ও সামাজিক সম্মানের ভয়ে অনেক ভিকটিম এখনো মুখ খুলছেন না, যার ফলে প্রকৃত ভিকটিমের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাব্বির এই অপরাধলব্ধ কর্মে অন্য কোনো সহযোগী বা বড় কোনো চক্র জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ রিমান্ডসহ বিস্তারিত তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। জনগণের সচেতনতা এবং ভিকটিমদের আইনি সহায়তা গ্রহণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
