এশিয়া-প্যাসিফিক (এপ্যাক) অঞ্চলের বীমা খাত ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁতির মুখে এক জটিল বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। অতীতে যেখানে জলবায়ুজনিত শারীরিক ঝুঁতিকে মূলত আন্ডাররাইটিং বা পলিসি নির্ধারণের সীমিত একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হতো, বর্তমানে তা আর্থিক ব্যবস্থার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ঝুঁতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বৈশ্বিক আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান MSCI পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে বিশ্বের ৫০টি বৃহৎ প্রপার্টি ও ক্যাজুয়ালটি বীমা এবং পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে উঠে এসেছে, পৃথকভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রস্তুত দাবি করলেও সামগ্রিকভাবে পুরো শিল্পখাত এখনও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষম নয়। এপ্যাক অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক বীমা প্রতিষ্ঠানই মনে করে, তাদের খাত এখনও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতিতে ভুগছে। তুলনামূলকভাবে উত্তর আমেরিকায় এই উদ্বেগের হার ৬২ শতাংশ এবং ইউরোপে ৪৬ শতাংশ।
এপ্যাক অঞ্চলে জলবায়ুজনিত শারীরিক ঝুঁকির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র। জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, এই ঝুঁকি আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মাঝারি থেকে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার প্রভাব ফেলতে পারে—যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ, এই অঞ্চলের বীমা খাত জলবায়ু ঝুঁকিকে কেবল ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমানের বড় আর্থিক হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে।
তবে উদ্বেগের মাত্রা যতই বেশি হোক, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার প্রবণতা স্পষ্ট। প্রায় ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উচ্চ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ৬৩ শতাংশ জানিয়েছে, তারা এখনও আন্ডাররাইটিং, ঝুঁকি তদারকি এবং মূলধন কাঠামোর সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি পুরোপুরি সংযুক্ত করতে পারেনি। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এখনও প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে অবস্থান করছে, যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতাকে সীমিত করে রাখছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিসংখ্যান এই চ্যালেঞ্জের গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান Swiss Re-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশ ক্ষতি এসেছে বন্যা, ঝড় ও দাবানলের মতো ‘সেকেন্ডারি পেরিল’ থেকে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করে।
নিম্নে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| সূচক | পরিমাণ (২০২৫) |
|---|---|
| মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি | ২২০ বিলিয়ন ডলার |
| বীমাকৃত ক্ষতি | ১০৭ বিলিয়ন ডলার |
| বীমাকৃত ক্ষতির অনুপাত | ৪৯% (রেকর্ড সর্বোচ্চ) |
| সেকেন্ডারি পেরিলের অবদান | ৯২% |
| বার্ষিক ক্ষতি বৃদ্ধির হার | ৫% – ৭% |
| সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ক্ষতির পূর্বাভাস | ৩২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত |
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি এবং পুনর্গঠন ব্যয় বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে ‘প্রোটেকশন গ্যাপ’ বা বীমাহীন ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি—যেখানে মোট ক্ষতির ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই বীমার আওতার বাইরে থেকে যায়।
আঞ্চলিক তুলনায় প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। ইউরোপের প্রায় ৬৮ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের সার্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু ঝুঁতি সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে এপ্যাক অঞ্চলে এই হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। একইভাবে, ইউরোপের ৭৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের আন্ডাররাইটিং ব্যবস্থাকে প্রস্তুত বলে মনে করলেও এপ্যাক অঞ্চলে এই হার মাত্র ২৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এখন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বোর্ড পর্যায়ের তদারকি জোরদার করা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো উন্নত করা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের মান বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—অনেক প্রতিষ্ঠান জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা শীর্ষ নির্বাহীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন বা প্রণোদনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করছে না। ফলে নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণে পর্যাপ্ত প্রভাব ফেলছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এপ্যাক অঞ্চলের বীমা খাতকে এই ব্যবধান দূর করতে হলে উন্নত ডাটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, শক্তিশালী নীতি কাঠামো এবং সর্বোপরি নেতৃত্ব পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুধু বীমা শিল্পকেই নয়, বৃহত্তর অর্থনীতিকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
