স্মৃতির পাতায় উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ

১৯৪৭ সালের শেষ ভাগ। উপমহাদেশ তখন বিভক্তির ক্ষত বহন করছে—মানচিত্রে নতুন সীমানা, মানুষের মনে অনিশ্চয়তা আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের টানাপোড়েন। এই উত্তাল সময়েই জন্মসূত্রে পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে অবস্থান করছিলেন উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অমর প্রতিভা—উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ। তাঁর পরিচয় কোনো রাষ্ট্রীয় সীমারেখায় বাঁধা ছিল না; তিনি ছিলেন কেবলই সুরের সাধক, যিনি কণ্ঠকে পরিণত করেছিলেন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায়।

রেডিও পাকিস্তানের আমন্ত্রণে তিনি নিয়মিত গান পরিবেশন করতেন। তাঁর কণ্ঠে খেয়াল ও ঠুমরির যে গভীরতা ফুটে উঠত, তা শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেত। রেকর্ডিং শেষ হলেও তাঁর সঙ্গীতসাধনা থেমে থাকত না। পেশোয়ার থেকে করাচি—বিভিন্ন শহরে সঙ্গীত আসরে তাঁর উপস্থিতি হয়ে উঠেছিল এক অনিবার্য নাম। সুর যেন তাঁর নিঃশ্বাস, আর গান ছিল তাঁর অস্তিত্বের মূল পরিচয়।

একদিন রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম পরিচালক তাঁকে একটি টেলিগ্রাম পাঠান। সম্মানসূচক আহ্বান পেয়ে তিনি সেখানে যান। আতিথেয়তায় ছিল চা, পান ও আনুষ্ঠানিক সৌজন্য। কিন্তু আলোচনার মূল বিষয়টি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তাঁকে অনুরোধ করা হয় তাঁর জনপ্রিয় ঠুমরির একটি অংশ থেকে “হায় রাম” শব্দ দুটি বাদ দিতে।

তিনি বিস্মিত হন। কারণ ওই শব্দ শুধু ধর্মীয় নয়—তা ছিল প্রেম, বেদনা এবং মানবিক আবেগের এক অনন্য প্রকাশ। তাঁর বিখ্যাত পংক্তি—“ইয়াদ পিয়া কি আয়ে, হায় রাম…”—শ্রোতার হৃদয়ে যে অনুভূতি জাগাত, তা ছিল অদ্বিতীয়।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন—যা ইতিহাসে এক প্রতীকী প্রতিবাদ হয়ে থাকে। তিনি বলেন, মূল ভাবনা ও আবেগকে কাটছাঁট করে সংগীতকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর এই অবস্থান শিল্পস্বাধীনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এরপর তিনি ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি জানান, সংগীত যদি সত্যিই প্রেম, বেদনা ও মানবিক অনুভূতির ভাষা হয়, তবে তাকে কোনো সংকীর্ণতার মধ্যে বন্দী রাখা উচিত নয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভারতের সাংস্কৃতিক পরিসরে যুক্ত হওয়ার।

জীবনী সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়তথ্য
জন্ম২ এপ্রিল ১৯০২
মৃত্যু২৩ এপ্রিল ১৯৬৮
প্রধান ধারাখেয়াল, ঠুমরি
ঘরানাকিরানা ঘরানা
কর্মক্ষেত্রউপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীত
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগভীর আবেগময় কণ্ঠ, রাগসঙ্গীতের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ

তিনি পরবর্তীতে কলকাতায় স্থায়ী হন—যে শহর দীর্ঘদিন ধরে শাস্ত্রীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক চর্চার এক উন্মুক্ত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে তাঁর সুর নতুন শ্রোতা খুঁজে পায়, এবং তিনি হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

তাঁর সংগীতের ভাণ্ডারে ছিল অসংখ্য রাগের অপূর্ব ব্যাখ্যা—ভৈরবী, দরবারি কানাড়া, বেহাগ কিংবা বিলাবল—প্রতিটি রাগ তাঁর কণ্ঠে নতুন রূপ পেত। তাঁর গায়কীতে আবেগ ও শাস্ত্রের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যেত, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মানদণ্ড তৈরি করে দেয়।

আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হলে মনে পড়ে সেই যুগ, যখন সঙ্গীত ছিল আত্মার সাধনা, বিনোদন নয়। উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, সুরের কোনো সীমান্ত নেই, ধর্ম নেই, বিভাজন নেই।

তাঁর স্মৃতি তাই কেবল ইতিহাস নয়, বরং উপমহাদেশের সঙ্গীত-ঐতিহ্যের এক অমর অধ্যায়।